একটি বই, তার পরিচয় দিতে গেলে প্রথম যে কথাটি আসে সেটি হল শিরোনাম। দ্বিতীয়ত শিরোনামদাতা, অর্থাৎ লেখকের নাম। এবং তৃতীয়ত বইটির জনরা, ঘরানা, ধরণ ইত্যাদি যা-ই বলা হোক তাকে।

এখানে এসেই আটকে গেছে বইটির পরিচয় পর্ব। কোন ঘরানার বলা যাবে একে? জীবনধর্মী? মনস্তাত্ত্বিক? অথবা স্রেফ কিশোর উপন্যাস?

মূল চরিত্রের নাম বেশ অদ্ভুত। অবসর! নামে তার পরিচয় আছে যেমন, সেই স্বকীয়তার সাথে সে নিজেও সমান অদ্ভুত। তাহলে কি বইটি ‘অদ্ভুত’ জনরার? অদ্ভুত অবসর-এর কিশোর বয়স, একটি চড়ুই পাখির সাথে তার বন্ধুত্ব এবং পুরো বইয়ের কিশোর সুলভ বর্ণনার সাদৃশ্যে এই প্রশ্ন বাতিল করে দেয়া যায়। তাহলে হয়ত কিশোর উপন্যাস! তবে ‘কিশোর’ অবসর-এর জটিল মনস্তাত্ত্বিক দিকটির পরিচিতি এই সম্ভাবনাকে বেশিক্ষণ টিকতে দিচ্ছে না আবার। সেক্ষেত্রে সোজাসুজি মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস বললেই হয়!

ইকো সিস্টেম ঠিক রাখার জন্য জীবনে কিছু বিষবৃক্ষের দরকার হয়। তবে সেই বৃক্ষের বিষ সহনীয় পর্যায় পার হয়ে গেলে তার উৎপাটন জরুরী। কিশোর অবসর-এর পারিপার্শ্বিক ঘটনা প্রবাহ, অল্প বয়সের এই ‘বিষ-অনুধাবন’ আর তদনুযায়ী নেয়া পদক্ষেপ… সব মিলিয়ে বইটিকে আসলে একটি ঘরানায় বাঁধতে পারেনি। তাই সে চেষ্টাকে অবসর দিয়ে আমাদের অবসর-কে নিয়ে কথা বলা যাক বরং।

দুর্ঘটনায় মা-বাবা হারানো, নাড়ি-ছেঁড়া প্রিয় মফঃস্বল ফেলে আসা, একমাত্র বোনের সংসারে একা চিলেকোঠায় বসবাস এবং বোনের অসহিষ্ণু স্বামীর ছায়ায় থাকা সহিষ্ণু অবসর। আপাত একলা জীবনে ছটফটে, সমবয়সী ইভা’র আবির্ভাবের পূর্বে চড়ুই পাখিটিই ছিল তার একমাত্র বন্ধু। চরিত্রায়নে আরও আছে ভুত গবেষক ময়নার মা, নিচ তলার ফিরোজ দাদা, মফঃস্বলের বন্ধু ইদরিস, স্নেহময়ী নিমাদি, সাহায্যের হাত বাড়ানো ডাঃ এনামুল। সবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংস্পর্শে, চড়ুই পাখি এবং তারএন্টি কাটার-এর সাহায্যে কিভাবে শেষমেশ বিষবৃক্ষের প্রভাব থেকে মুক্তি পেলো জীবন, ফিরোজ দাদা পেলেন স্বাধীনতা, অবসর পেলো তার মনস্তাত্ত্বিক জগতের ব্যাখ্যা… সেটি চমকপ্রদ বই কিছু নয়।

উপন্যাসটি পড়ে মিশ্র অনুভূতির শিকার হতে হবে। অতঃপর আঁতিপাঁতি ‘জনরা’ খুঁজতে থাকা বইটির জন্য ‘অন্যরকম’ ব্যতীত আর কোনও সংজ্ঞা খুঁজে পাওয়া যাবেনা। বইয়ের পরিচয়পর্ব নিজে যতটুকু দাবি করে, ততটুকু সম্পূর্ণ করতে গেলে স্পয়লার চলে আসার সম্ভাবনা বিষম। এটুকুই বলা যায় যে, শেষ করে মনে হয়েছে সবার জীবনে একটি চড়ুই পাখি থাকলে মন্দ হত না।

‘বিষবৃক্ষ’ ইকবাল মাহমুদ ইকু’র দ্বিতীয় একক উপন্যাস। ’১৬ বইমেলায় প্রকাশিত রোমান্টিক উপন্যাস ‘নীলান্ত জোছনায়’ এর পরে দ্বিতীয় বইতে এসে লেখকের পরিবর্তন চোখে পড়ার মত এবং ততোধিক প্রশংসনীয়। একেবারে ভিন্ন আবহেরউপন্যাস ‘বিষবৃক্ষ’ পাঠককে পূর্বের চেয়ে কোনও অংশে কম মুগ্ধ করবে না, বরং ক্ষেত্রবিশেষে বেশিই আকৃষ্ট করবে, সে কথা বলে দেয়ার অপেক্ষায় বসে নেই। ইকবাল মাহমুদ ইকু’র জন্য শুভকামনা ও ভালবাসা… তার অন্যরকম উপন্যাস ‘বিষবৃক্ষ’ এর জন্যেও।

ইকবাল মাহমুদ ইকু’র দ্বিতীয় একক উপন্যাস বিষবৃক্ষ বইয়ের বরাবরের মত চমৎকার প্রচ্ছদটি করেছেন তিহিমনি। এক রঙ্গা এক ঘুড়ি থেকে প্রকাশিত বইটি পাওয়া যাবে বাংলা একাডেমি মূল ভবনের সাথেই “লিটল ম্যাগাজিন চত্বর” এর “মেঘফুল” স্টলে।
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৮০ পৃষ্ঠা।
বিক্রয় মুল্যঃ ১৪০ টাকা।

রিভিউ লিখেছেন আবিদ মাহমুদ