অনেকের মতো ছোটবেলা থেকেই আমার বেশি ঝোঁক ছিল বই পড়ার দিকে৷ ঘরে খুব বেশি থাকা হতো, তাই সময় কাটানোর সেরা মাধ্যম ছিল বই পড়া৷ তবে এর চেয়েও যেটি বেশি ছিল তা হলো, বিচিত্র সব বিষয়ের প্রতি আগ্রহ৷ ভালো লাগত নতুন কিছু জানতে, নতুন কিছু সম্পর্কে পড়তে৷ বেশির ভাগ কিশোরের যেমন কিশোর অ্যাডভেঞ্চার বা রহস্য গল্পের দিকে আগ্রহ থাকে, আমারও তাই ছিল৷ তবে ক্লাস সেভেন–এইটে উঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আর সৈয়দ মুজতবা আলী পড়ে ফেলি৷ বই পড়া কিংবা সংগ্রহের ব্যাপারে কিশোর বয়সে আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন আমার শিক্ষক চন্দ্রনাথ সাহা৷ বৃত্তির জমানো টাকা দিয়ে বই কেনা হতো, টাকা জমিয়ে বই কেনাটা ওই বয়সেই স্থান করে নিয়েছিল অভ্যাসের তালিকায়৷

amrajaraboipori
শুয়ে-বসে হাতে তুলে নিয়ে অলসদুপুর কিংবা কোনো অবসরে বই নিয়ে পড়ে থাকা, বইয়ের পাতা ওল্টানোর সঙ্গে সঙ্গেই গল্পের ভেতর ধাপে ধাপে এগোনো আর বইয়ের পাতার ঘ্রাণে গল্পের জীবন্ত হয়ে ওঠা—এই ব্যাপারগুলো অনুভব করতাম৷ এখনকার তরুণ প্রজন্মও সেই অনুভূতিগুলো অনেকটা একই রকমভাবে ধরে রেখেছে নিজেদের মানসে৷ যে কারণে কাগজের পত্রিকার প্রতি নির্ভরতা কমে এলেও তরুণেরা কাগজে ছাপা বই-ই পছন্দ করছেন৷ শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী তরুণেরা কাগজের বইকে ‘পিডিএফ’ সংস্করণের চেয়ে এখনো বেশি এগিয়ে রেখেছেন পছন্দের তালিকায়৷ বইয়ের পাতা ওল্টানোর সঙ্গে গল্পের এগিয়ে চলার যে অনুভূতি, তা কম্পিউটার বা স্মার্টফোনে পিডিএফ ফাইল স্ক্রল করার মধ্যে নেই৷ বই কতটুকু পড়া হলো বা আরও কতটুকু বাকি পৃষ্ঠার কলেবর দেখে এটুকু বোঝার সামর্থ্য পিডিএফ ফাইল বা ই-বই দেয় না৷ ডিজিটাল বইয়ের তথ্যের প্রকাশভঙ্গিটা বড্ড নীরস, যেটা এখনো তরুণেরা সেভাবে গ্রহণ করেননি, যতটা তাঁরা প্রযুক্তির অন্যান্য অগ্রসরতা ও যান্ত্রিক বিবর্তনকে গ্রহণ করেছেন৷ কাগজের বইয়ে গুরুত্বপূণ৴ পয়েন্টগুলো চিহ্নিত বা মার্ক করে রাখতে পারার একটা সুবিধাও পাওয়া যায়৷ ডিজিটাল বইয়েও চিহ্নিত করার সুযোগ রয়েছে, তবে সে ক্ষেত্রে দাগটা মস্তিষ্কে কম বরং যন্ত্রেই বেশি কাটে৷ বোকার মার্কেট নামে একটি বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপে এসেছে ২০১২ সালে বিশ্বে যত বই বিক্রি হয়েয়ে তার ১৩ শতাংশ আর ২০১৩ সালে এ হার ১৪ শতাংশ৷ মানে ই–বই বা ইলেকট্রনিক বুকের বিক্রি বাড়ার হার এখনো বেশ ধীর৷
কাগজের বইয়ের প্রতি তরুণদের চাহিদা বেশ ভালো টের পাওয়া যায় রকমারি ডট কমে তরুণদের অর্ডারের নমুনা দেখলে৷ যে বইটা অনলাইনে কোনো সাইট থেকে খুঁজে পিডিএফ ফাইল দিব্যি পাওয়া যেতে পারে, সেসব বইও তরুণেরা রকমারি ডট কমে অর্ডার করে থাকেন৷ এ ব্যাপারে তামিম শাহরিয়ারের লেখা কম্পিউটার প্রোগ্রামিং বইটির উদাহরণ দেওয়া যায়৷ বইটির ডিজিটাল সংস্করণ সহজলভ্য হওয়ার পরও এটি রকমারি ডট কমের ‘বেস্ট সেলার’ হয়েছে৷ সুতরাং কাগজের বইয়ের প্রতি তরুণ প্রজন্মের ভালোবাসা ও নির্ভরতার জায়গাটা এখনো বেশ পাকাপোক্তই বলা চলে৷ যুগের সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল বইয়ের চাহিদা যে বাড়বে না তা নয়, তবু তরুণদের মধ্যে কাগজের বইয়ের জনপ্রিয়তা কমতে পারে, তেমন আশঙ্কা আমার মনে জাগে না৷
তরুণদের মধ্যে কাগজের বই টিকে আছে বলেই বইয়ের অনুমোদনহীন স্ক্যান করা পিডিএফ ফাইল ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকলেও তা প্রকাশনাশিল্পে বড়সড় প্রভাব এখনো ফেলতে পারেনি৷ তবে বইয়ের মূল্যমান সম্পর্কে আমাদের ধারণা ও মূল্যায়ন এখনো যথাযথ নয়৷ বইয়ের দাম পৃষ্ঠা অনুসারে হওয়া উচিত নয়, বরং হওয়া উচিত বিষয়বস্তু বা কনটেন্ট অনুসারে৷ শিল্পকে সঠিক মূল্য দেওয়া সম্ভব হলে শিল্পও বেঁচে থাকবে, বেঁচে থাকবেন শিল্পীও৷ সেই সঙ্গে বই কিনে পড়ার অভ্যাসের সঙ্গে তরুণদের আরও বেশি পরিচিত হওয়া প্রয়োজন৷ কাগজের বই কিনে পড়ার আনন্দ শুধু সে আনন্দের সঙ্গে পরিচিত পাঠকেরাই জানেন৷
লেখক:মাহমুদুল হাসান তরুণ উদ্যোক্তা, রকমারি ডট কমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা