এমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান অধ্যাপনা করেছেন বাংলা সাহিত্যে, কিন্তু গবেষণায় ছাপিয়ে গেছেন সাহিত্যের পরিসীমা। সম্পৃক্ত থেকেছেন দেশের বিভিন্ন প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গে। তাঁকে দেওয়া চন্দ্রাবতী একাডেমির আজীবন সম্মাননা উপলক্ষে গৃহীত এ সাক্ষাৎকারে সাজ্জাদ শরিফ-এর কাছে তিনি তুলে ধরেছেন ব্যক্তিগত থেকে সামাজিক নানা প্রসঙ্গ।

আনিসুজ্জামান_আমরা যারা বই পড়ি

সাজ্জাদ শরিফ: আপনার দাদা, বাবা, আপনি—বাঙালি মুসলমান সমাজের বিবর্তনের ধারার একটি উদাহরণ হিসেবে আপনাদের দেখা যেতে পারে। মুসলিম স্বাতন্ত্র্য নিয়ে আপনার দাদা আবদুর রহিমের গর্ব ছিল। তিনি লেখালিখি করেছেন ইসলাম ধর্ম ও মুসলমান সমাজের গৌরবময় মুহূর্তগুলো নিয়ে। পাকিস্তান আন্দোলনে আপনার আগের প্রজন্মের উৎসাহ ও সমর্থন ছিল। পরবর্তী প্রজন্মে—আপনাদের সময়ে—আপনারা পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চলে গেলেন। এই পরিবর্তন দিয়ে শুরু করা যাক।

আনিসুজ্জামান: আমার দাদা মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদ নিয়ে কথা বলেছেন, বঙ্গভঙ্গের পক্ষে থেকেছেন। আমার আব্বা ছিলেন অরাজনৈতিক মানুষ, তবে তিনি পাকিস্তান আন্দোলন সমর্থন করেছেন। আমরা স্কুলে পড়ার সময়ে পাকিস্তানের পক্ষে স্লোগান দিয়েছি এবং পাকিস্তান চেয়েছি। আমার মনে জিজ্ঞাসা জাগল ১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে—যাকে বলা হয় ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’। আমরা তখন কলকাতায়। আমি মানুষ খুন হতে দেখলাম। আমাদের পাড়া থেকে মানুষ চলে গেল। আমাদের বাড়িতেও অন্য পাড়া থেকে এসে আত্মীয়স্বজন আশ্রয় নিল। মানুষের সে কী দুর্দশা! একগাদা দুস্থ ছেলেমেয়ে—প্রায় সবাই বাবা-মা হারানো—তারা জায়গা নিল আশ্রয়-শিবিরে। হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা, মানুষের মৃত্যু—এসব আমার মন-মানসিকতা বদলে দেয়।

১৯৪৭ সালে দেশভাগ হলো। আমরা কলকাতা থেকে খুলনায় চলে এলাম। ১৯৪৮ সালে ভাষা নিয়ে আন্দোলন শুরু হলো। এস এম আমজাদ হোসেন, যিনি মোনায়েম খাঁর সময়ে শিক্ষামন্ত্রী হয়েছিলেন, তখন খুলনা মুসলিম ছাত্রলীগের নেতা। তিনি আমাদের বোঝালেন, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করলে পাকিস্তান শেষ হয়ে যাবে। কথাটি আমার বিশ্বাস হলো। স্কুলে ধর্মঘট হলো। ধর্মঘট পালন করলাম, কিন্তু মিছিলে গেলাম না। আমি দোলাচলে পড়ে গেলাম। একদিকে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি; আবার পাকিস্তান টিকে থাক, সেটাও চাচ্ছি। ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় চলে এলাম। ১৯৪৯ সালে ভর্তি হলাম স্কুলে। ১৯৫০ সালে আবার সীমান্তের দুপারে দাঙ্গা। তখন আমি প্রবল দাঙ্গাবিরোধী। আমাদের স্কুলে উদ্বাস্তু শিবির হলো। আমাদের এক শিক্ষক ছুরিকাঘাতে আহত হলেন। এসব আমার মনে গভীর প্রভাব ফেলতে শুরু করল। তখন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়েই পাকিস্তানের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যেতে শুরু করে। ততদিনে আমি দশম শ্রেণীতে পড়ি। বুঝে গেছি, বাংলা কেন রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত। এভাবে ধীরে ধীরে আমার মধ্যে পরিবর্তন হতে থাকে। যখন কলেজে উঠেছি, তখন আমার মনোভাব মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে আমি সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছি। মনে হয়েছে, এই আন্দোলনের জন্য আমি প্রাণ পর্যন্ত দিতে পারি। ১৯৫২ সালের পর আমি বামপন্থী রাজনীতির সংস্পর্শে আসি। বলা যায়, ১৯৪৬ থেকে ১৯৫২—এই ছয় বছরে ধীরে ধীরে আমার মনোভাবে একটা বড়রকম পরিবর্তন আসে।

সাজ্জাদ: হাসান হাফিজুর রহমানের ঐতিহাসিক ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সংকলনের সঙ্গেও আপনি যুক্ত হয়েছিলেন। তখনকার লেখক-শিল্পী গোষ্ঠীর সঙ্গে আপনার সখ্য গড়ে উঠল কীভাবে?

আনিসুজ্জামান: পাকিস্তান সাহিত্য সংসদে যাওয়াটা আমার আকস্মিকভাবে হয়েছে। শিল্পী আমিনুল ইসলাম আমাদের প্রতিবেশী ছিলেন। তাঁর মাধ্যমেই হাসান হাফিজুর রহমান, মুর্তজা বশীর, বিজন চৌধুরী, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর—এঁদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তারপর সাহিত্য সংসদ হলো, সেখানে আমি যাচ্ছি। সেখানে সাহিত্যসভা করতে করতে একটি দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠছে, সেটা উপলব্ধি করছি।

সাজ্জাদ: পাকিস্তান জন্ম নেওয়ার পাঁচ বছরের মাথায় এই একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে আমাদের রাজনৈতিক অভিযাত্রা পাল্টে গেল। যে-বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবার দানা বাঁধতে শুরু করবে, তাঁর অন্যতম ভরকেন্দ্র হয়ে উঠবেন রবীন্দ্রনাথ। আমরা রবীন্দ্রনাথকে ঠিক কোন নতুন মাত্রায় আবিষ্কার করেছি?

আনিসুজ্জামান: রবীন্দ্রনাথের প্রতি কৌতূহলটা নতুন করে জেগেছে ভাষা আন্দোলনের পর। এর আগে বেতারে রবীন্দ্রনাথের গান-নাটক হচ্ছে, কবিতা আবৃত্তি হচ্ছে, গল্প-উপন্যাসের নাট্যরূপ হচ্ছে। বাধা কিন্তু ছিল না। রবীন্দ্রনাথ আমাদের জাতিসত্তার সঙ্গে সহজেই জড়িয়ে ছিলেন। বাঙালি পরিচয়ের কথা যখনই ভাবা হলো, তখন স্বাভাবিকভাবেই রবীন্দ্রনাথ চলে এলেন।

আমি যে প্রথম দিকে বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে লিখেছি, সেটি অনেকটা অস্বাভাবিক। অত পেছনে কেন চলে গেলাম? আমি ভেবেছিলাম, বাংলা সাহিত্যের সবটুকু যদি আমার হয়, তাহলে বঙ্কিমচন্দ্র আমার নয় কেন? বঙ্কিমচন্দ্রের ব্যাপারে সমাজের বিদ্যমান যে-আপত্তি, সেটা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়েও আমার প্রশ্ন ছিল। ‘বঙ্কিমচন্দ্র ও আনন্দমঠ’ নামে ১৯৫৩ সালে আমি প্রবন্ধ লিখি। আমাদের পাঠ্যবই সাহিত্য পরিচিতিতে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের অংশটি পরিবেশিত হয়েছিল কিন্তু অখণ্ডিতভাবে। আমার কাছে মনে হয়েছিল, বাংলা সাহিত্যে যা আছে, সবই আমার। বঙ্কিমচন্দ্র যদি সাম্প্রদায়িক হয়ে থাকেন, তাহলে এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজাও জরুরি, কেন তিনি সাম্প্রদায়িক হলেন? আবার বঙ্কিমচন্দ্রের প্রেরণায় যে এত মানুষ উপনিবেশ-বিরোধী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হলেন, সেটাও তো লিখতে হবে। এভাবে আমার মনটা অন্যরকমভাবে গড়ে উঠেছিল। বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে প্রবন্ধ লেখার পরই আমার মনে হলো, মুসলমানদের মধ্যে যারা স্বাতন্ত্র্যবাদী, তাঁদের চেতনার বিকাশের ধরন নিয়ে লিখতে হবে।

সাজ্জাদ: কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র যে-জাতীয়তাবাদের প্রেরণা হয়ে উঠেছিলেন, তার মধ্যে কি বাঙালি মুসলমানের প্রবেশাধিকার ছিল?

আনিসুজ্জামান: বঙ্কিমচন্দ্রের সময়টাতে বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্তের বিকাশ হয়েছে। কাজেই তাঁদের মধ্যে যে-হিন্দু জাতীয়তাবাদ স্ফুরিত হলো, তার চেয়ে মুক্তদৃষ্টি অবলম্বন করার মতো বাস্তবতা সেখানে ছিল না। বঙ্কিমচন্দ্র একদিকে স্বাধীনতা চাইছেন, আবার ইংরেজ শাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন। ওই কৃতজ্ঞতাবোধও হিন্দু মধ্যবিত্তের বিকাশের আকাঙ্ক্ষা থেকে। তাঁর সাম্প্রদায়িক মনোভাবের পেছনেও সেই একই কারণ। কিন্তু তাঁকে যতটা সাম্প্রদায়িক বলা হয়, ততটা তিনি নন। কেননা তাঁর লেখায় অনেক উদার মুসলমান চরিত্রও আছে।

সাজ্জাদ: ‘মুসলিম-মানস ও বাংলা সাহিত্য’ বইটির সর্বশেষ ভূমিকায় আপনি লিখেছেন, এটি এখন লিখলে আপনি আরও অনেক প্রশ্ন তুলতেন। খেলাফত আন্দোলনকে আপনি ইতিবাচক বলে ভেবেছেন। কিন্তু ধর্মকেন্দ্রিক এসব আন্দোলনের ক্ষতিকর প্রভাব তো পরবর্তী ইতিহাসে পড়েছে। উপনিবেশ-বিরোধী সংগ্রামের কারণে ওয়াহাবি বা ফারায়েজি আন্দোলনকে আমরা প্রগতিশীল বলে মহিমা দিয়েছি। সেগুলোর প্রতিক্রিয়াশীল ভাবাদর্শ নিয়ে প্রশ্ন তুলিনি। সেসব আন্দোলনের মহিমা আমরা প্রশ্নহীনভাবে আত্মস্থ করেছি। পরবর্তীকালে আমাদের এখানে ধর্মীয় উগ্রপন্থার জমি তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে কি তা কোনো ভূমিকা রেখেছে?

আনিসুজ্জামান: আমরা যাকে ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন বলি, এর ইতিবাচক দিকগুলো আমাকে বেশি আকর্ষণ করেছে। ওয়াহাবি আন্দোলনের ইতিবাচক দিক হচ্ছে এর ইংরেজ-বিরোধী চেতনা। অন্যদিকে আবার এর সংকীর্ণতার দিকটিও উপেক্ষা করার মতো নয়। ফারায়েজি আন্দোলনের ইতিবাচক দিক হচ্ছে ইংরেজ-বিরোধী আন্দোলনে কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করা। এর প্রভাবে আবার হিন্দু আর মুসলমানদের মধ্যে পার্থক্য খুব বেড়ে গেল। এমনকি এঁরা মুসলমান সমাজকেও বিভক্ত করে ফেললেন। এর চেয়ে বেশি কিছু আমি বলিনি। তবে বলা উচিত ছিল। কাজী আবদুল ওদুদ তাঁর বইয়ে ওয়াহাবি আন্দোলনের নেতিবাচক দিকটি দেখিয়েছেন। আমি সেটি অগ্রাহ্য করেছি। আমি বেশি গুরুত্ব দিয়েছি ইতিবাচক দিকটির ওপর। যেমন পিরবাদের বিরোধিতা আমাকে আকৃষ্ট করেছে, কিন্তু এঁদের গোঁড়ামি যে বিরক্তিকর, সেদিকে গুরুত্ব দিইনি।

সাজ্জাদ: আমরা এমন একটি ধারণা পেয়ে এসেছি যে, বাংলা গদ্যের জন্ম হয়েছে উপনিবেশের গর্ভে। কিন্তু ‘পুরোনোবাংলা গদ্য’ বইয়ে আপনি দেখিয়েছেন, উপনিবেশের বহু আগে থেকেই বাংলা গদ্য ছিল এবং ইতিহাসের অভিজ্ঞতার ভেতর সেটি ক্রমশ স্পষ্ট আকার পাচ্ছিল। আপনার কি মনে হয় উপনিবেশের হস্তক্ষেপ ছাড়াই বাংলা গদ্য নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারত?

আনিসুজ্জামান: দাঁড়াত, অবশ্যই দাঁড়াত। ঝোঁকটা ওই দিকেই ছিল। নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তো বাংলা গদ্য ক্রমাগত বিকশিত হয়ে উঠছিল। নানা ক্ষেত্রে গদ্যের ব্যবহার বাড়ছিল। শুধু ব্যবহারিক ক্ষেত্রে নয়, ভাবের বাহন হিসেবেও। কাজেই এটি বিকাশ লাভ করতই। কিন্তু বাঙালির জীবনে পদ্যের অসাধারণ প্রভাব গদ্যকে আড়ষ্ট করে রেখেছিল। গদ্যে লেখা উচিত এমন বহু জিনিসও পদ্যেই লেখা হতো।

সাজ্জাদ: গ্রিস, ইতালি বা ইংল্যান্ডে মধ্যযুগে কবিরা যেসব ধর্মগাথা রচনা করেছেন এবং যুগ যুগ ধরে যা তাদের ভাষাভাষীর মনকে প্রভাবিত করেছে, সেসব উচ্চ সাহিত্যের মর্যাদা পেয়েছে। আমাদের প্রাচীন সাহিত্যেও কি এমন কিছু আছে যা তেমন মর্যাদা পেতে পারত, কিন্তু আধুনিকতার গর্বে আমরা তা দিতে পারিনি?

আনিসুজ্জামান: আমার তা মনে হয় না। হয়তো বৈষ্ণব জীবনী-সাহিত্য যে-গুরুত্ব পেতে পারত, আমরা তা দিইনি। তাছাড়া অন্য বিষয়ে আমরা কার্পণ্য করিনি। ইংরেজের সংস্পর্শে আসার আগে আমাদের সাহিত্যে অনুকরণ আর পুনরাবৃত্তিই ছিল প্রধান। তার মধ্যেও যে পালাবদল হয়নি, তা নয়। তবে তা হাতে গোনা। একেক শতাব্দীতে আমরা মাত্র একজন-দুজন করে বড় কবির নাম পাচ্ছি—চণ্ডীদাস, আলাওল, মুকুন্দরাম, ভারতচন্দ্র। এই বদল অবশ্যই বাঙালি সমাজের অন্তর্নিহিত প্রাণশক্তির পরিচয়। শক্ত একটি কাঠামো বজায় থাকছে যুগের পর যুগ। আবার সে কাঠামো ভেঙে হঠাৎ করে কেউ কেউ বেরিয়েও যাচ্ছেন। এটা অনিবার্যভাবে আমাদের সামনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। আবার এসব পরিবর্তনের মধ্যে কিছু কিছু বিষয় স্থিরও থেকে গেছে। যেমন নায়িকার কিন্তু ওই একই চোখ, একই নাক, একই ঠোঁট। এটা অবশ্য গ্রিক সাহিত্যেও আছে।

সাজ্জাদ: কোনো কোনো ঘটনার তাৎপর্য পরবর্তীকালে ইতিহাসের পরিবর্তিত পটভূমিতে অনেক পাল্টে যায়। মুক্তিযুদ্ধকে এ সময়ে আপনি কোন তাৎপর্যে গ্রহণ করবেন?

আনিসুজ্জামান: একাত্তর থেকে আমরা মূলনীতিগুলো তো অবশ্যই নেব। এগুলো ছেড়ে দেওয়া যাবে না। এর যেকোনো একটি বদলে গেলে বাংলাদেশেরও চেহারা বদলে যাবে। আমি চতুর্থ সংশোধনী মেনে নিতে পারি না, কারণ সেটি চার নীতির সঙ্গে যায় না। জিয়াউর রহমানের সংশোধন, এরশাদের সংশোধন—এগুলোর কোনোটাই মেনে নেওয়ার মতো নয়। বাংলাদেশ রাখতে হলে ওই চারটা স্তম্ভ আমাদের ধরে রাখতে হবে। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, গত ৪০ বছরে নানা ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতে মনে হয় মানুষের মনোভাবের পরিবর্তন হয়েছে। ধর্ম নিয়ে যে-সম্প্রীতির বোধ আমাদের মধ্যে ১৯৭০-৭১ সালে ছিল, এখন সেটা অনেক ক্ষয় হয়ে গেছে। এখন আর কেউ দাঙ্গা হচ্ছে শুনে বাড়ি থেকে দৌড়ে আক্রান্তের পাশে ছুটে যায় না। অনেক আপত্তিকর ওয়াজ, নসিহত বা ফতোয়া মানুষ বিনা প্রতিবাদে মেনে নেয়। নেতাদের অনেকে বলেন, ধর্মের কথা না বললে সমর্থন চলে যাবে। ১৯৭০ সালে এটা মনে করার কোনো কারণ ছিল না। এমনকি ১৯৫০ সালেও না। ১৯৪৮-৪৯ সালে মওলানা ভাসানী অসাম্প্রদায়িক একটি দেশের কথা বলেছেন, সোহরাওয়ার্দী বলেছেন, ১৯৫৪-৫৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন। এঁরা পাকিস্তানের তুঙ্গ মুহূর্তে ধর্মনিরপেক্ষ সমাজকে দেখতে পেয়েছিলেন। ধর্ম এখন একটি দেখানোরও বিষয় হয়ে উঠেছে। নিজেদের মুসলমান প্রমাণ করার কোনো চেষ্টা তখন ছিল না। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমরা যে-রাষ্ট্রীয় মূলনীতিগুলো পেয়েছিলাম, সেগুলোর পক্ষে নেতারা আমাদের টেনেছিলেন, এখন কেন আমাদের নেতারা জনগণকে তৈরি করছেন না?

সাজ্জাদ: আমাদের রাজনৈতিক অস্থিরতার দায় তো আছেই। কিন্তু আপনার কি মনে হয়, মুক্তিযুদ্ধকালে বুদ্ধিজীবী-হত্যাও স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জন্য এক ব্যাপক ক্ষতির কারণ হয়েছে? জাতির ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা প্রজন্মান্তরে সঞ্চার করা যদি বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম দায়িত্ব হয়, তাঁদের অনুপস্থিতিতে আমরা একটি শূন্যতায় পড়েছি। তা পরবর্তীকালে জাতি হিসেবে তো আমাদের ইতিহাসগত কোনো সামষ্টিক মূল্যবোধের ওপর দাঁড়ানোর সুযোগ দেয়নি। এ ব্যাপারে আপনার কী ধারণা?

আনিসুজ্জামান: একাত্তরে আমরা যে বুদ্ধিজীবীদের হারিয়েছি, নিশ্চয় তাঁরা দেশের জন্য অনেক কিছু করতে পারতেন। আমরা তা থেকে বঞ্চিত হয়েছি। কাজেই বড় একটা ক্ষতি তো হয়েছেই। তবে সেটাও পূরণ হতে পারত। কিন্তু বঙ্গবন্ধু-হত্যার পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তিকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনলেন। এটা বড় একটা ক্ষতিকর পরিবর্তনের কারণ। একদিকে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধগুলো গৌণ হয়ে গেছে। অন্যদিকে নানারকম সুবিধাবাদের বিকাশ ঘটেছে। এই প্রক্রিয়া এরশাদ আমলেও চলল। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠতে পারল না। গড়ে উঠবে উঠবে করে আওয়ামী লীগ আমলেও তা গড়ে উঠল না। ফলে পুরোনো মূল্যবোধগুলো থাকল না, আবার নতুন কোনো মূল্যবোধও প্রতিষ্ঠিত হলো না। সার্বিকভাবে একধরনের সুবিধাবাদ জায়গা করে নিল। শহীদ বুদ্ধিজীবীরা চিরন্তন মূল্যবোধের কথা বলেছেন, শুভ-অশুভর কথা বলেছেন। কিন্তু আমরা তাকে আপেক্ষিক বলে, চরম সত্য নয় বলে সরিয়ে দিচ্ছি। আজকের যে সামাজিক অবক্ষয়, তার পেছনে এই কারণগুলো কাজ করেছে। এখনকার বুদ্ধিজীবীরা মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে অনেক ক্ষতি হয়েছে।

উৎস:সহায়ক এক