দুর্যোগে সম্পূর্ণ লন্ডভণ্ড ফসলের ক্ষেতের দিকে অশ্রুসজল করুণ চোখে হতভাগ্য কৃষক তাকান,ঠিক সেভাবেই নিজের করা ত্রিশ বছরের অধ্যাপক জীবনের দিকে তাকিয়েছেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।কিভাবে সোনার ফসল ফলানো মাঠ ধু ধু চরে পরিণত হল,তার বয়ান।বইয়ের নাম তাই ‘নিষ্ফলা মাঠের কৃষক’।

বইয়ের ভূমিকায় এই গুণী মানুষ লিখেছেনঃ

একদিন, তরুণ বয়সে, স্বপ্নতাড়িতের মতন এসে যোগ দিয়েছলাম শিক্ষকতায়।প্রতিটা শিরা-ধমনিকে সেদিন যা কামড়ে ধরেছিল তা এক উদ্ধাররহিত স্বপ্ন-সমৃদ্ধ মানুষ গড়ে তোলায় অংশ নেবার স্বপ্ন-সেইসব মানুষ যারা একদিন জাতির জীবনে পালাবদল ঘটাবে। আমার সে স্বপ্ন সফল হয়নি। গত চার দশকে, জাতীয় জীবনের সামগ্রিক অবক্ষয়ের হাত ধরে, আমাদের শিক্ষাঙ্গন ধীরে ধীরে এমন এক নির্বীজ মৃত্যুর শিকারে পরিণত হয়েছিল যে সম্পন্ন বা মহৎ কোনোকিছুর জন্মই সেখানে কার্যত অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। এই বিশাল পতনের মুখে কোনো একক ব্যক্তির আলাদাভাবে কিছু করার ছিল না। আমার পক্ষেও তা সম্ভব হয়নি।আমার এই বই আমাদের সম্পন্ন শিক্ষাঙ্গনের নীরক্ত মাঠে অবসিত হবার গ্রুপ।

শুধু নিজের অধ্যাপনার সময়ের কথাই যে লিখেছেন তেমনটা না।লিখেছেন নিজের শিক্ষকদের কথা যাদের কথা পড়লে মাথা এমনিতেই শ্রদ্ধায় নুয়ে আসে।অসাধারণ সেইসব শিক্ষক সম্ভবত এখন রূপকথার গল্পের নায়ক হয়ে গেছেন।তাঁদেরকে মনে হয় অতলের গহবরে হারিয়ে যাওয়া কিংবদন্তী।বইয়ের শুরুতেই অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ লিখেছেন তাঁর স্কুল ও কলেজের সেইসব শিক্ষকের কথা যারা তাঁর মনে তো বটেই পাঠকের মনেও শ্রদ্ধার আঁচড় কেটে গেছে।আহ!শুধু শিক্ষক না,যেন একই সঙ্গে স্নেহশীল পিতা ও মমতাময়ী মাতার গুণে গড়া বন্ধুও।যাঁরা নিজেরা প্রদীপের সলতে হয়ে আগুনে জ্বলে ছাত্রের জীবনে আলো দান করেন।পরের অংশে লেখক বর্ণনা করতে শুরু করেছেন তাঁর নিজের শিক্ষকতা জীবনের গল্প।বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় পাশ করা এক তরুণ কিভাবে শিক্ষকতার মত পেশাতে এল এবং বিভিন্ন কলেজে শিক্ষার আলো বিলিয়ে যেতে থাকলেন সে বর্ণনা পড়তে পড়তে নিজেই যেন তাঁর ক্লাসরুমের ছাত্র হয়ে যাই।আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্ভবত বাংলাদেশের একমাত্র লেখক যিনি বাংলাদেশের শিক্ষাজগতের গুণগত মানের অধঃপতনের ব্যাপারটা বইয়ের পাতায় আদ্যোপান্ত লিখে গেছেন।তিনি একটা টিপিং পয়েন্টের মধ্য দিয়ে এসেছেন যার আগে দেখেছেন শিক্ষকতা পেশার মহান চেহারা আর এর পরে শিক্ষতার নির্লজ্জ ভয়াল রূপ।কিভাবে ধাপে ধাপে একটা দেশ ও জাতির শিক্ষাব্যবস্থা ধসে পড়ে তা একেবারে চলচ্চিত্রের মত ধরা পড়বে পাঠকের চোখে।শিক্ষাঙ্গনে ক্যান্সারের মত সন্ত্রাসের বিস্তার দেখেছেন নিজের চোখে।চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না সম্ভবত।কারণ সারা দেশটাই যে রাহুর গ্রাসে।আসলে স্বাধীনতাপূর্ব ও স্বাধীনতাউত্তর ত্রিশ বছরের সামরিক শাসনই সবচাইতে বেশি ক্ষতি করেছে আমাদের।এর সাথে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক ছিল ১৯৭১ এর বিপ্লব।এত বড় একটা বিপ্লবের আফটারশক ঠিকভাবে সামাল দিতে পারিনি আমরা। সব মিলিয়ে হতাশাজনক অবস্থা এবং পতনের চূড়ান্ত।আরও কিছু পরের দিকে শিক্ষকদের বিতরণকারী থেকে বিপণনকর্মী হয়ে যাওয়ার লজ্জাজনক অধ্যায় লেখক তুলে এনেছেন সুনিপুণ দক্ষতায়।নকলপ্রবণতা,গৃহশিক্ষক সমস্যা কিংবা ত্রুটিপূর্ণ প্রশ্নব্যবস্থা সহ আরও কিছু বিষয় উইপোকার মত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে গিলে খেয়েছে কিংবা খাচ্ছে তা বুঝার জন্য এর চাইতে ভালো কিছু হতে পারে না।বইয়ের উপসংহারে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ লিখেছেন নিজের স্কুল জীবনের ভয়াল শিক্ষকদের কথা।আরও লিখেছেন নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন ধরনের শিক্ষকের কথা যারা বিভিন্নভাবে তাঁর কাছে বিভিন্নভাবে গুরুত্বপূর্ণ।বিশ্লেষণ করেছেন এই দেশের বেশ কয়েকজন নামজাদা শিক্ষকের।

তবে এই বইয়ের একটা ছোট অংশের কথা না বললে চমকপ্রদ অংশের কথা বাদ পড়ে যাবে।সেটা হচ্ছে জন্মনিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচী কিভাবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেছে তার বর্ণনা।একরকম অদৃশ্য একটা কালো হাত যেন!

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এর লেখার মান বা সাহিত্যরস যাচাই করার যোগ্যতা আমার মত নাদানের পক্ষে অসম্ভব।আমি তাঁর একজন গুণমুগ্ধ পাঠক ও ভক্ত।বাংলাদেশের যেসব শিক্ষার্থী শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে চায় কিংবা যারা শিক্ষাব্যবস্থার গুনগত মান সত্যিকার অর্থেই উন্নত করতে চান তাঁদের জন্য এই বই অবশ্যপাঠ্য বলে মনে করি।

রিভিউটি পড়ার পর কি বইটি পড়তে ইচ্ছা করছে? ?
তাহলে এখনি ডাউনলোড করে পড়ে নিন।
ডাউনলোড লিংক

এই সুন্দর রিভিউটি লিখেছেন
আবদুল্লাহ ভাই
পূর্ব প্রকাশ
সরবে