ক্যানসার তত দিনে পাকাপোক্ত জায়গা নিয়ে ফেলেছে তাঁর শরীরে। ঘণ্টা চল্লিশেক পরেই তিনি চলে যাবেন চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে। তার আগে ধানমন্ডির দখিন হাওয়ার বাসায় মুখোমুখি হয়েছিলাম হুমায়ূন আহমেদের। সেই সাক্ষাতের বিস্তারিত ছাপা হয়েছে ছুটির দিনের প্রচ্ছদ রচনায়। কিন্তু সাক্ষাৎকারের এই জাদুবিষয়ক আলাপচারিতার সিংহভাগই অপ্রকাশিত। সাক্ষাৎকার গ্রহণের দিনটি ছিল ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১১।

হুমায়ন আহমেদ,হিমু,অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার

ম্যাজিক নিয়ে আপনার প্রবল আগ্রহ…

আমার নানান দিকে আগ্রহ। এর একটা হচ্ছে ম্যাজিক। ম্যাজিক নিয়ে আগ্রহটা বলা যেতে পারে বেশ প্রবল। আমার বাসাভর্তি ম্যাজিকের যন্ত্রপাতি। যেখানে যাই, ম্যাজিকের যন্ত্রপাতি নিয়ে যাই। কিন্তু ম্যাজিক যে সব সময় দেখাই, ঠিক তা নয়। আবার মনে করো ছবি আঁকা। এ রকম নানা আগ্রহের বিষয় আছে।

অনেক নামী জাদুশিল্পীর কাছে শুনেছি, আপনি জাদুর হাত-সাফাইয়ের কাজে বাংলাদেশে সেরাদের একজন।হাত-সাফাই সম্ভবত জাদুশিল্পের সবচেয়ে আদি রূপ।

ম্যাজিকের প্রথম কথাটা হচ্ছে লুকিয়ে রাখা। হাত-সাফাইটা সেই রকম। এই কাজে বছরের পর বছর সাধনা করতে হয়। খুব সহজে কাজটা হয় না। এ কারণে এখন আর এটা কেউ করতেও চায় না। এখন বেশির ভাগ ম্যাজিশিয়ান শুরুতেই যন্ত্রপাতির দিকে চলে যায়। কিন্তু আমার শুরুটাই হয়েছে ‘পামিং’ দিয়ে। বছরের পর বছর চুইংগাম নিয়েছি। পয়সা হাতের উল্টো পিঠে লাগিয়ে রেখেছি। খুলে যায় আবার লাগাই। এভাবে হাতটাকে সেনসিটিভ করেছি। এখন পয়সা লুকিয়ে রাখা আমার কাছে খুব সহজ।

‘ম্যাজিক মুন্সি’ নামে একটি বই আপনি লিখেছেন। বাস্তবে ম্যাজিক মুন্সি টাইপের মানুষের সঙ্গে কি আপনার দেখা হয়েছে?

না। বাস্তবে সে রকম কিছু ঘটেনি। এটা পুরোপুরিই আমার কল্পনা থেকে লেখা। জাদুর ব্যাপারটা আরেকটু বলি। এর সঙ্গে ফিল্মের মিল আছে। দেখো, ফিল্মে আমরা করি কী, একটা কাটিং পয়েন্ট নিই। মনে করো, একটা লোক হাত নামাচ্ছে এটা তোমার কাটিং পয়েন্ট। যখন লোকটা হাত নামাচ্ছে একটা জিনিস মুভমেন্টে থাকে, তখন দর্শকের দৃষ্টিটা থাকে হাতের ওপর। ম্যাজিকেও তো তা-ই। আমি এই হাতটা তুললাম, সঙ্গে সঙ্গে তোমার দৃষ্টি চলে যাবে আমার হাতের দিকে। তুমি অন্যদিকে তাকাতে পারবে না। আমি তাকালাম এই দিকে। সঙ্গে সঙ্গে তোমাকেও তাকাতে হবে এই দিকে। যেই মাত্র তুমি এদিকে তাকালে, এই সময়ে আমার হাত দিয়ে আমি যেকোনো কিছু করতে পারি। আমি যেদিকে তাকাব, সেদিকে না তাকিয়ে উপায় নেই। ইউ আর বাউন্ড টু ডু দ্যাট। ম্যাজিকের ভাষায় এটাকে বলে…যাক ভুলে গেছি। কোন ধরনের ম্যাজিক আপনার প্রিয়? বাচ্চারা যেগুলোয় মুগ্ধ হয়, সেই সব ম্যাজিক প্রিয়। বাচ্চারা দেখবে সব ম্যাজিকে মুগ্ধ হয় না। একটা পয়সা নিলাম। একটা পেনসিল নিলাম। পয়সাটাকে এখানে রাখলাম। একটু পরে দেখা গেল পেনসিল পয়সাটিকে খেয়ে ফেলল। বাচ্চারা সারপ্রাইজড। পেনসিল কী করে পয়সাটাকে খায়! এ রকম জাদু আমার ভালো লাগে।

স্যার, একটা প্রোগ্রাম আপনি দেখেন কি না জানি না। নাম ‘ম্যাজিকস বিগেস্ট সিক্রেট’।

এএক্সএন চ্যানেলে এটা দেখায়। শুনেছি, সব জাদুশিল্পী এটার বিরুদ্ধে। এখানে সব প্রচলিত জাদুর কৌশল ফাঁস করে দেওয়া হয়। এটা খুব খারাপ। খুবই অন্যায়। একজন বছরের পর বছর সাধনা করে একটা জিনিস শেখে। বছরের পর বছর সাধনা এবং আস্তে আস্তে কৌশলটা ডেভেলপ হয়। এই যে যেমন এভাবে কলমটা হাতের তালুতে রাখলাম (তিনি কলম নিয়ে করে দেখালেন)।

হাত কাত করলেও এটা পড়ছে না। এখন সবাই এটা মোটামুটি বুঝে গেছে। এই জাদু দেখাতে গেলেই বলবে, ও বুঝতে পারছি, তুমি অন্য হাতের আঙুল দিয়ে পেছন থেকে এটা ধরে রাখছ। এখন এটার উন্নত রূপটা কী? তুমি হাতটাও সরিয়ে নিলে। কিন্তু কলম পড়ল না। এটা কীভাবে সম্ভব? এই যে তোমার হাতে ঘড়ি আছে, দাও দেখাই। তোমার হাতটা বাড়াও। ঘড়ির চেনের সঙ্গে কলমটা আস্তে করে আটকে দিয়ে হাতটা সরিয়ে নিলে। এ কারণে কলমটা পড়ছে না। দর্শক অবাক। কারণ, ঘড়ির কথা তারা ভাবেনি। এভাবে ম্যাজিক ডেভেলপ করে আস্তে আস্তে। আপনার প্রিয় ম্যাজিশিয়ান কে? বাংলাদেশে তো ডেফিনেটলি জুয়েল আইচ। তাঁর কোনো বিকল্প নেই। ম্যাজিকের প্রতি তাঁর যে আগ্রহ, ডেডিকেশন। আনবিলিভেবল।

সহায়ক:এক