হুমায়ূন আহমেদ [১৩ নভেম্বর ১৯৪৮—১৯ জুলাই ২০১২] প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল
হুমায়ূন আহমেদ [১৩ নভেম্বর ১৯৪৮—১৯ জুলাই ২০১২] প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল

খুব ছোটবেলায় বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ একবার বগুড়া জিলা স্কুলে একটা নাটকে রাজপুত্রের অভিনয় করেছিল। আমরা ছোটরা ছিলাম দর্শক। তার পোশাকটা ছিল নীল, মঞ্চের আলোয় তার মুখটাও তখন নীল দেখাচ্ছিল। তারপর সে যখন গত বছর জুলাই মাসের ১৯ তারিখে চলে গেল, তাকে পরে আমরা নুহাশপল্লীতে শুইয়ে দিয়ে এলাম তার সমাধিতে। তখনো তার মুখটা ছিল নীল। তারপর এক বছর কেটে গেল। আমেরিকার ডাক্তাররা নাকি বলে দিয়েছিল, তার শরীরের রং বদলে মাটির সঙ্গে মিশে যেতে শুরু করবে ঠিক এক বছর পর।
কিশোর সেই রাজপুত্র বাংলা সাহিত্যের বরপুত্র হয়ে তার নুহাশপল্লীর মাটিতে মিশে যেতে শুরু করেছে। আহা, পৃথিবী কী আশ্চর্য জায়গা! যে আসে তাকে চলে যেতে হয়। মিশে যেতে হয় গহিন মৃত্তিকায়।
কোনো এক দার্শনিক নাকি বলেছিলেন, নারীর শরীরে যখন একটি ভ্রূণ পল্লবিত হয়ে উঠতে থাকে, তখন জীবনের সঙ্গে সঙ্গে একটি মৃত্যুর অনিবার্য ইশারাও পল্লবিত হতে থাকে। খুবই সত্যি কথা। এ প্রসঙ্গে একটা গল্প শোনা যেতে পারে। চীন দেশের গল্প—
চীনের এক পরিবারে এক শিশু জন্ম নিল। কী অপরূপ শিশু! সবাই ভিড় করে দেখতে এল, যেন দেবশিশু। একজন মন্তব্য করল, এই শিশু বিরাট পণ্ডিত হবে। আরেকজন বলল, এ হবে বিশাল এক ধনকুবের। আরেকজন বলল, এ মহাচীনের মহাসম্রাট না হয়েই যায় না! তাদের মধ্যে একজন দার্শনিকও ছিলেন। সবাই তাকে ধরল, হে মহান দার্শনিক, আপনিই বলুন এই দেবশিশু সত্যি কী হবে?
মহান দার্শনিক স্মিত হাসলেন, বললেন, ‘এই শিশু কোনো একদিন মহাপণ্ডিত হবে কি না, আমরা এখনো নিশ্চিত নই। এই শিশু বিশাল কোনো ধনকুবের হয়ে উঠবে কি না, সেটাও আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না। কিংবা এই শিশু সত্যিই একদিন মহাচীনের মহাসম্রাট হবে কি না, সেটাও আমরা এখন বলতে পারছি না। তবে…’
তবে? সবাই ব্যগ্র চোখে তাকাল তার দিকে।
তবে এই শিশুরও একদিন মৃত্যু হবে, এটুকু এখন বলতে পারি।
হয়তো দার্শনিক সবাইকে বোঝাতে চেয়েছিলেন, মৃত্যু অনিবার্য। জীবনের বাইরে একমাত্র মৃত্যুকেই নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব। মৃত্যুকেই পালন করা সম্ভব প্রতিবছর। 
বড় ভাইয়ের সমাধি তৈরি হচ্ছে নুহাশপল্লীতে। সুন্দর আর্কিটেকচারাল ডিজাইনে। আমার খুব ভালো লেগেছে ডিজাইনটা। অনেকটা জায়গা নিয়ে অনুপম এক ভাবগাম্ভীর্যময় পরিবেশে সে শুয়ে আছে মাটির অনেকটা নিচে। আমার মাকে নিয়ে গিয়েছিলাম (প্রায়ই যেতে হয়)।

মা সমাধির ওপরে সিঁড়ি দিয়ে উঠে হাত বাড়িয়ে হাহাকার করে উঠলেন। আমাকে বললেন, ‘শাহীন, এরা এটা কী করল? আমি তো ওকে ছুঁতে পারছি না রে!’
আহা কী কষ্ট! মায়ের ছোট্ট হাত তার সবুজ কবর পর্যন্ত পৌঁছায় না বলে মায়ের এই হাহাকার। আমি মাকে বোঝালাম, মা, মৃত্যু যাদের মহান করে, তাদের কাছে পৌঁছানো সব সময়ই কঠিন। তার কর্ম তাকে যেমন মহান করেছে, মৃত্যুও তাকে আরও অনেক বেশি মহিমামণ্ডিত করেছে! আমার মা সমাধির বেদিতে হাত রেখে কাঁদতে লাগলেন।
হুমায়ূন আহমেদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে অনেকেই আমাকে কিছু লিখতে বলছে। কিন্তু কী লিখব? সে নেই, তার পরও আমরা দিব্যি আছি। জীবনের নিয়মে এ যেন এক ধরনের গার্হস্থ্য বেঁচে থাকা। তবে আমি একটা কাজ করেছি। আমার মায়ের অনুরোধে সব প্রকাশকের কাছ থেকে তার সব বই সংগ্রহ করেছি এক কপি করে। নতুন একটা বুক শেলফে সাজিয়ে রেখেছি পরপর। এখান থেকে একটি বইও কেউ নিতে পারবে না। তার মোটা মোটা বইগুলোর পুটে তার ছবি আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। আমার মা আর স্ত্রী মিলে মাঝেমধ্যেই বুক শেলফের কাচ সরিয়ে বই বের করে ঝাড়পোঁছ করেন। যদিও তার দরকার নেই। নতুন বুক শেলফের মোটা কাচ ভেদ করে তার ঝকঝকে নতুন বইয়ের মোড়কে ময়লা-ধুলো ঢোকা অসম্ভব। কে জানে, তারা হয়তো আসলে কষ্টের জমে ওঠা ধুলোগুলো সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন বইয়ের মলাট মুছে মুছে। আর এ জন্যই হয়তো কোনো কবি লিখেছিলেন—

‘স্মৃতির ধুলোয় জমেছে কষ্ট কতটা
হায়! যতটা দুঃখ তার চেয়ে বেশী বুকের ভিতর কষ্টটা…!’

উৎস: সহায়ক এক