• ক্রিস্টালের ফ্রেমবন্দী হুমায়ূন আহমেদ ও শাওন।হুমায়ন আহমেদ,হুমায়ন আহমেদ ,ইবুক,ইবুক ডাউনলোডক্রিস্টালের ফ্রেমবন্দী হুমায়ূন আহমেদ ও শাওন

৬জুন ২০১২।

আতাহার উদ্দীনের গাড়িতে হুমায়ূন আহমেদ, শাওন ভাবি, তাঁর মা তহুরা আলী, নিষাদ-নিনিত ও আমি রওনা হলাম ‘পিয়ার সেভেনটিন’-এর উদ্দেশে। ওখানে আমাদের দুপুরের খাবার খাওয়ার কথা।
আতাহার আমার কলেজজীবনের বন্ধু রুবেলের ঘনিষ্ঠজন। রুবেল ও আতাহার উদ্দীন দুজনই নিউইয়র্কে বসবাস করছে বহু বছর ধরে। রুবেলের সূত্রে তাঁর সঙ্গে আমার ও হুমায়ূন-পরিবারের ইতিমধ্যেই বেশ সখ্য গড়ে উঠেছে। চমৎকার মানুষ তিনি।
আতাহার সব সময় মিড টাউন টানেল দিয়ে ম্যানহাটান যাওয়া-আসা করেন। প্রতিবার ছয় ডলার দিতে হয় বলে অনেকেই এই টানেল ব্যবহার করে না। টানেল থেকে বের হলেই ম্যানহাটানের প্রথম অ্যাভিনিউ এবং ২৪ স্ট্রিট। সেখান থেকে আমরা চলে যাব লোয়ার ম্যানহাটানে ইস্ট রিভার ও ব্রুকলিন ব্রিজের মাঝ বরাবর ১৭ নম্বর জেটির পাশে সাউথ সি পোর্টে। সেখানেই ‘পিয়ার সেভেনটিন’ অবস্থিত। মূলত এই জায়গাটি নিউইয়র্ক সিটির আদি সমুদ্রবন্দর। এখানে টুরিস্টরা ভিড় জমায় আনন্দ-ফুর্তি, কেনাকাটা ও ভোজনবিলাসের খোঁজে।
হুমায়ূন আহমেদ এসবের আকর্ষণে এখানে আসেন না। তিনি আসেন মূলত এখানকার বিশাল ফুডকোর্টে অবস্থিত প্লে জোনে তাঁর দুই শিশুপুত্রের আনন্দ উপভোগ করতে।
মিড টাউন টানেলে ঢোকার পর আতাহার জানতে চাইলেন আমরা দুপুরের খাবার খেয়েছি কি না। তাঁকে জানানো হলো, দুপুরের খাবার খেতেই তো পিয়ার সেভেনটিনে যাচ্ছি। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘ওখানকার খাবার খুব বেশি ভালো হবে না। আমি আপনাদের “আলীবাবা”তে খাওয়াব। খেয়ে দেখেন, খুবই মজার খাবার।
হুমায়ূন আহমেদ বললেন, ‘আমি পিয়ার সেভেনটিনে যেতে চাই।’ আতাহার বললেন, ‘আমরা এখানে দুপুরের খাবার খেয়ে পিয়ার সেভেনটিনে যাব এবং অনেকক্ষণ থাকব।’ হুমায়ূন আহমেদ রাজি হলেন এবং আমরা টার্কিশ রেস্টুরেন্ট আলীবাবাতে ঢুকে গেলাম। ভেতরে ঢুকে কোনার বড় একটা টেবিলে আমরা বসলাম। হুমায়ূন আহমেদের পছন্দ অনুযায়ী মেন্যু দেখে খাবার অর্ডার দিলেন আতাহার। খুব তৃপ্তিসহকারে সবাই দুপুরের খাবার শেষ করলাম। আমি ফ্রেশরুমে যাওয়ার কথা বলে কাউন্টারে গিয়ে বিলটা দিয়ে দিলাম। আতাহার বা রুবেলের সঙ্গে বাইরে বের হলে মানিব্যাগে হাত দেওয়া কঠিন।
আতাহার ডেজার্ট অর্ডার দিয়েছেন এর মধ্যে। আমি চুপচাপ খাবার টেবিলে গিয়ে বসলাম। কিছুক্ষণ পর ওয়েটার শুধু ডেজার্টের বিল নিয়ে এল। আতাহার বাকি বিল আনতে বললে ওয়েটার জানাল, অন্যান্য বিল দেওয়া হয়ে গেছে। তিনি খুব অসন্তুষ্ট হলেন, কিন্তু খুশি হলেন হুমায়ূন আহমেদ। তিনি আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে বললেন, খুবই ভালো কাজ করেছ। কেন একজন মানুষ সব সময় বিল দিয়ে যাবেন!
যাহোক, আমরা বেরিয়ে পিয়ার সেভেনটিনে পৌঁছালাম। আমেরিকার সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগতভাবে সংগৃহীত ঐতিহাসিক নৌযানের সংগ্রহশালা রয়েছে এখানে। হুমায়ূন আহমেদের খুব পছন্দের জায়গা এটি। এর আগেও কমপক্ষে চার-পাঁচবার আমরা এখানে এসেছি। হাসপাতাল থেকে কেমো শেষ করে বাড়ি ফেরার পথেও একবার এখানে এসেছিলাম হুমায়ূন আহমেদের পছন্দের কারণে।

  • কুকুরছানাকে আদর করছেন হুমায়ূন আহমেদ। পাশে পুত্র নিষাদকুকুরছানাকে আদর করছেন হুমায়ূন আহমেদ। পাশে পুত্র নিষাদ

গ্রীষ্মকাল হওয়ায় আজ চমৎকার আবহাওয়া। ঝকঝকে পরিষ্কার আকাশ। হালকা ঠান্ডা বাতাস বইছিল। ছুটির দিন হওয়ায় অসংখ্য টুরিস্ট ভিড় জমিয়েছে এখানে। আমরা চেনা রাস্তায় পিয়ার সেভেনটিনের নিচতলায় প্রবেশ করলাম। ঢোকার মুখেই একটি ক্রিস্টালের থ্রিডি ফটোগ্রাফির দোকান। ছবি তুলে মুহূর্তের মধ্যে ক্রিস্টালের ভেতর থ্রিডি ইফেক্ট দিয়ে প্রিন্ট করে দেওয়া হয়। হুমায়ূন আহমেদ একটা ছবি তুলতে চাইলেন শাওন ভাবিকে নিয়ে। এর আগেও যতবার এখানে এসেছেন, প্রতিবারই তিনি এটা করতে চেয়েছেন। ভাবি নানা অছিলায় পরের বার এলে তুলবেন বলে এড়িয়ে গিয়েছেন। হুমায়ূন আহমেদ জেদ ধরলেন, এবার তিনি ছবি তুলবেনই এবং যাওয়ার সময় নিয়ে যাবেন। এক ঘণ্টা পর ক্রিস্টালের ছবি ডেলিভারি দেওয়া হয়। ভাবি কিছুতেই ছবি তুলবেন না। তিনি বলছেন, আজকে ছবি তোলার প্রস্তুতি নেই। তা ছাড়া নিজেদের তোলা ছবি পেনড্রাইভে এনে দিলেও ওরা এটা বানিয়ে দেয়। পরের বার সঙ্গে করে ছবি নিয়ে এসে এখান থেকে ক্রিস্টালে প্রিন্ট করিয়ে নেওয়া যাবে। হুমায়ূন আহমেদ নাছোড়বান্দা। তিনি আজই এটা করে নিয়ে যাবেন। তাঁর কথা হলো, ‘এটা তুমি আগেও অনেকবার বলেছ, কিন্তু কখনোই ছবি আনোনি। প্রতিবারই তুমি ভুলে যাও। তাই আজই ওদের ক্যামেরায় ছবি তুলে নিয়ে যাব আমি।’ দুজনই জেদ ধরলেন। পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে দেখে আমি ভাবিকে বললাম, স্যার যখন এত করে বলছেন আজই তুলুন না। ভালো না হলে পরে আরেকটা বানাবেন। ভাবি বললেন, ‘প্রতিবার এক শ ডলার করে লাগবে সেটা জানেন? কেন আমি এতগুলো ডলার নষ্ট করব!’
ভাবির আম্মা একটু দূরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি এবার এগিয়ে এসে বললেন, শাওন, হুমায়ূন যখন আজকেই ছবি তুলে ওটা বানাতে চায় করো না কেন? এর মধ্যে হুমায়ূন আহমেদ বললেন, আজ না হলে তিনি আর এটা কখনোই করবেন না। অবশেষে ভাবি রাজি হলেন। হাসিমুখে দুজনের ছবি তোলা হলো।
আমরা এলিভেটর দিয়ে পিয়ার সেভেনটিনের ওপরের ফ্লোরে চলে গেলাম, যেখানে বাচ্চাদের নানা ধরনের খেলার ব্যবস্থা আছে। নিনিত কথা বলতে পারে না। বড় ভাই যেটাতে ওঠে, সে-ও সেটাতে গিয়ে চড়ে বসে। আর পছন্দ না হলে কাঁদতে কাঁদতে হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় বাবাকে। এদিকে কোয়াটার শেষ হতেই নিষাদ দৌড়ে বাবার কাছে আসছে। তিনি আবার কোয়াটার দিচ্ছেন। শেষ হলে আমাকে বলছেন, মাজহার, যাও, কোনো দোকান থেকে ডলার ভাঙিয়ে কোয়াটার নিয়ে এসো। পিতা-পুত্রের আনন্দ যেন শেষ হতে চায় না। আমি বেশ কিছু ছবি তুললাম।
সন্ধ্যা হয়ে আসছে। কাচঘেরা এই চত্বরের বাইরে তাকালেই ইস্ট রিভারের ওপর ব্রুকলিন ব্রিজ চোখে পড়ে। ব্রিজের আলো জ্বলে উঠছে। সূর্যাস্তের রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়েছে নদীর ওপর। ছোট ছোট নৌযান চলাচল করছে। আমাদের বিদায় নেওয়ার সময় হয়ে গেছে। বেরিয়ে আসার সময় ক্রিস্টালের ছবির দোকান থেকে ছবিটা নেওয়া হলো। একটা কালো বক্সের মধ্যে সুন্দর করে সাজিয়ে ডেলিভারি দিয়েছে ওরা। হুমায়ূন আহমেদ গভীর মনোযোগ দিয়ে স্বামী-স্ত্রীর যুগল ছবিটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখছেন। চোখ-মুখে একধরনের আনন্দের দ্যুতি। যেকোনো নতুন কিছু সৃষ্টিতেই সব সময় তাঁকে দেখেছি আনন্দিত হতে, যা কখনো শিশুদের আনন্দকেও ছাড়িয়ে যায়। নুহাশপল্লীতে যখন বড় আকারের একটা অ্যাকুরিয়াম বানানো হলো তখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাচ্চাদের নিয়ে অ্যাকুরিয়ামের নানা রঙের মাছ দেখতেন তিনি।
পিয়ার সেভেনটিন থেকে বের হয়ে আসার সময় দেখা গেল একজন টুরিস্ট অনেকগুলো কুকুরের বাচ্চা নিয়ে বসে আছে। হুমায়ূন আহমেদ নিষাদকে নিয়ে এগিয়ে গেলেন বাচ্চাগুলোর দিকে। অসাধারণ সুন্দর বাচ্চাগুলো। তিনি অনুমতি নিয়ে কুকুরের বাচ্চাগুলোকে আদর করলেন আর আমাকে বললেন, ‘মাজহার, ছবি তোলো।’ আমি কিছু দুর্লভ মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দী করলাম। হুমায়ূন আহমেদ খুব কম সময়ই নিজের ছবি আগ্রহ নিয়ে তুলতে চান।
রাতে বাসায় এলেন হুমায়ূন আহমেদের বাল্যবন্ধু ফানসু মণ্ডল ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না ভাবি। সঙ্গে সঙ্গে ক্রিস্টালের ছবিটা বের করে তাঁদের দেখালেন তিনি। ওটার মধ্যে ওপর থেকে আলো ফেললে থ্রিডির সম্পূর্ণ ইফেক্ট পাওয়া যায়। বন্ধুকে লাইটের নিচে নিয়ে ছবিটা দেখাচ্ছেন হুমায়ূন আহমেদ। আমি তাঁর আনন্দ দেখে বিস্মিত। এরপর যাঁরাই বাসায় আসছেন, সবাইকে একই রকম আনন্দ নিয়ে দেখাচ্ছেন তিনি। আমাকে বললেন, ‘মাজহার, তুমি দেশে যাওয়ার সময় তোমার আর স্বর্ণার (আমার স্ত্রী) একটা ছবি এভাবে করে নিয়ে যাবে অবশ্যই।’
১২ জুন ২০১২ বেলভিউ হাসপাতালে তাঁর অপারেশন হলো। ১৯ জুন তিনি বাড়ি ফিরে এলেন। অপারেশন-পরবর্তী জটিলতায় ২১ জুন আবার তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হলো। আশা-নিরাশার দোলাচলে কাটল পরের কটি দিন। অবশেষে সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে গেল ১৯ জুলাই।
‘পিয়ারে সেভেনটিন’-এ আর আসা হলো না তাঁর। আমিও হুমায়ূন আহমেদের কথা রাখতে পারলাম না। এ নিয়ে কোনো আফসোস নেই আমার। সান্ত্বনা শুধু এটুকুই যে, ওই দিন হুমায়ূন আহমেদ জোর করে ছবি না তুললে তাঁদের এই ফ্রেমবন্দী ছবিটাও হয়তো হতো না। আজ এই ছবি নিষাদ-নিনিত আর তাদের মায়ের জন্য মহামূল্যবান এক স্মৃতিস্মারক।

উৎস সহায়ক:এক