humayun_zafar

যারা খবরের কাগজে লেখালেখি করেন, কার্টুন কিংবা কমিক স্ট্রিপ আঁকেন, পৃথিবীর সব দেশেই

তাদের লেখালেখি কার্টুন কমিক একটা সিন্ডিকেটের ভেতর দিয়ে অনেক পত্রিকায় এক সাথে ছাপা হয়। সে জন্যে শুধু একটা নির্দিষ্ট পত্রিকার পাঠক নয়, সব পত্রিকার পাঠকেরাই সবার লেখা পড়তে পারেন। আমাদের দেশেও এটা হয় কিন্তু শুধু বিদেশি লেখক বা শিল্পীদের জন্যে। আমাদের নিজের দেশের লেখক বা শিল্পীদের কেন এই সুযোগটা দেয়া হবে না সেটা আমি অনেককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সবাই বলেছেন আমাদের দেশে এটা সম্ভব নয়, আমিও সেটা মেনে নিয়েছিলাম। কিছুদিন আগে আমার কী মনে হলো কে জানে, দেশের অনেকগুলো খবরের কাগজের সাথে যোগাযোগ করে জিজ্ঞেস করলাম, তারা কী একদিনে সবাই একজনের লেখা ছাপাতে রাজি আছেন, অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম সবাই রাজি! সেই এক্সপেরিমেন্টের ফসল আমার এই লেখা- তবে সেজন্যে আমার একটা মূল্য দিতে হয়েছে, কথা দিতে হয়েছে নিয়মিতভাবে লিখতে হবে, প্রতি দুই সপ্তাহে একবার। আমার মতো অলস মানুষের জন্যে সেটা অনেক বড় মূল্য!

প্রথম লেখাটি বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে, আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে সে আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন। তার কথা খুব মনে পড়ে।]

295431_3291173450025_1708254765_n

১.
হুমায়ূন আহমেদ আমার বড় ভাই তাকে নিয়ে নৈর্ব্যক্তিকভাবে কিছু লেখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়,

সেটাই লিখি তার মাঝে ব্যক্তিগত কথা চলে আসবে, আশা করছি পাঠকেরা সেজন্যে আমাকে ক্ষমা করবেন।
হুমায়ূন আহমেদ এই দেশের একজন বিখ্যাত মানুষ ছিল, বিখ্যাত মানুষেরা সবসময় দূরের মানুষ হয়, সাধারণ মানুষের কাছে তাদের পৌঁছানোর সুযোগ থাকে না। হুমায়ূন আহমেদ মনে হয় একমাত্র ব্যতিক্রম, কম বয়সী তরুণেরা তার বই থেকে বই পড়া শিখেছে, যুবকেরা বৃষ্টি আর জোছনাকে ভালোবাসতে শিখেছে, তরুণীরা অবলীলায় প্রেমে পড়তে শিখেছে। সাধারণ মানুষেরা তার নাটক দেখে কখনো হেসে ব্যাকুল কিংবা কেঁদে আকুল হয়েছে।

(হুমায়ূন আহমেদ কঠিন বুদ্ধিজীবীদেরও নিরাশ করেনি, সে কীভাবে অপ-সাহিত্য রচনা করে সাহিত্য জগৎকে দূষিত করে দিচ্ছে তাদের সেটা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ করে দিয়েছে।) হুমায়ূন আহমেদ শুধু বিখ্যাত হয়ে শেষ করে দেয়নি সে অসম্ভব জনপ্রিয় একজন মানুষ ছিল। আমিও সেটা জানতাম কিন্তু তার জনপ্রিয়তা কত বিশাল ছিল সেটা আমি নিজেও কখনো কল্পনা করতে পারিনি। তার পরিমাপটা পেয়েছি সে চলে যাবার পর (আমি জানি এটি এক ধরণের ছেলেমানুষী, কিন্তু মৃত্যু কথাটি কেন জানি বলতে পারি না, লিখতে পারি না)।

ছেলেবেলায় বাবা মা আর ছয় ভাইবোন নিয়ে আমাদের যে সংসার ছিল সেটি ছিল প্রায় রূপকথার একটি সংসার। একাত্তরে বাবাকে পাকিস্তানি মিলিটারিরা মেরে ফেলার পর প্রথমবার আমরা সত্যিকারের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিলাম। সেই দুঃসময়ে আমার মা কীভাবে বুক আগলে আমাদের রক্ষা করেছিলেন সেটি এখনো আমার কাছে রহস্যের মতো। পুরো সময়টা আমরা রীতিমত যুদ্ধ করে টিকে রইলাম, কেউ যদি সেই কাহিনীটুকু লিখে ফেলে সেটা বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের উপন্যাসের মতো হয়ে যাবে। তখন লেখাপড়া শেষ করার জন্যে প্রথমে আমি তারপর হুমায়ূন আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছি। হুমায়ূন আহমেদের আগেই সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিতি ছিল, ফিরে এসে সে যখন লেখালেখির পাশাপাশি টেলিভিশনের নাটক লেখা শুরু করল হঠাৎ করে তার জনপ্রিয়তা হয়ে গেলা আকাশ ছোঁয়া। দেশে ফিরে এসে প্রথমবার বইমেলায় গিয়ে তার জনপ্রিয়তার একটা নমুনা দেখে আমি হতবাক হয়ে গেলাম!

এতদিনে আমাদের ভাইবোনেরা বড় হয়েছে, সবারই নিজেদের সংসার হয়েছে। বাবা নেই, মা আছেন সবাইকে নিয়ে আবার নূতন এক ধরণের পরিবার, হুমায়ূন আহমেদের হাতে টাকা আসছে, সে খরচও করছে সেভাবে। ভাইবোন তাদের স্বামী স্ত্রী ছেলেমেয়ে সবাইকে নিয়ে সে দিল্লী না হয় নেপাল চলে যাচ্ছে, ঈদের দিন সবাই মিলে হৈচৈ করছে – সবকিছু কেউ যদি গুছিয়ে লিখে ফেলে আবার সেটি একটি উপন্যাস হয়ে যাবে, এবারে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস!

এক সময় আমাদের সেই হাসিখুশি জীবনে আবার বিপর্যয় নেমে এলো। তিন মেয়ে আর এক ছেলে নিয়ে আমার ভাবী আর হুমায়ূন আহমেদের বিয়ে ভেঙ্গে গেল। কেন ভেঙ্গে গেল, কীভাবে ভেঙ্গে গেল সেটি গোপন কোনো বিষয় নয়, দেশের সবাই সেটি জানে। আমি তখন একদিন হুমায়ূন আহমেদের সাথে দেখা করে তাকে বললাম, ‘‘দেখো, তুমি তো এ দেশের একজন খুব বিখ্যাত মানুষ। তোমার যদি শরীর খারাপ হয় তাহলে দেশের প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত তোমাকে দেখতে চলে আসেন। তোমার তুলনায় ভাবী তার ছেলেমেয়ে নিয়ে খুব অসহায়, তার কেউ নেই। তোমার যদি আপত্তি না থাকে তাহলে আমি টিঙকু ভাবীর সাথে থাকি? তোমার তো আর আমার সাহায্যের দরকার নেই। ছেলেমেয়ে নিয়ে ভাবীর হয়তো সাহায্যের দরকার।’’

হুমায়ূন আহমেদ আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, ‘‘ঠিক আছে। তুই টিংকুর সাথে থাক।’’
সেই থেকে আমরা টিংকু ভাবীর সাথে ছিলাম, তার জন্যে সেরকম কিছু করতে পারিনি, শুধু হয়তো মানসিকভাবে পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। ভাইয়ের স্ত্রী না হয়েও যেন আমাদের পরিবারের একজন হয়ে থাকতে পারে, সবাই মিলে সেই চেষ্টা করেছি। খুব স্বাভাবিকভাবে ধীরে ধীরে হুমায়ূন আহমেদের সাথে একটা দূরত্ব তৈরি হতে শুরু করেছিল। মায়ের কাছ থেকে তার খবর নিই, বেশিরভাগ সময় অবশ্যি খবরের কাগজেই তার খবর পেয়ে যাই। সে অনেক বিখ্যাত, অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, তার উপর জীবন অনেক বিচিত্র, সেই জীবনের কিছু কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা নিয়ে তার উপর যে অভিমান হয়নি তা নয়, দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেনে নিয়েছি। পরিবর্তিত জীবনে তার চারপাশে অনেক শুভাকাঙ্খি, তার অনেক বন্ধু, তার অনেক ক্ষমতা, তার এই নূতন জীবনে আমার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়নি।

গত বছর এরকম সময়ে হঠাৎ করে মনে হলো এখন তার পাশে আমার থাকা প্রয়োজন। ক্যান্সারের চিকিৎসা করার জন্যে নিউ ইয়র্ক গিয়েছে, সবকিছু ভালোভাবে হয়েছে। শেষ অপারেশনটি হয় করার আগে দেশ থেকে ঘুরে গেল, সুস্থ সবল একজন মানুষ। যখন অপারেশন হয় প্রতি রাত ফোন করে খোঁজ নিয়েছি, সফল অপারেশন করে ক্যান্সার মুক্ত সুস্থ একজন মানুষ বাসায় তার আপনজনের কাছে ফিরে গেছে, এখন শুধু দেশে ফিরে আসার অপেক্ষা। তারপর হঠাৎ করে সবকিছু ওলট-পালট হয়ে গেল, সার্জারি পরিবর্তিত অবিশ্বাস্য একটি জটিলতার কারণে তাকে আবার হাসপাতারে ফিরে যেতে হলো। আমি আর আমার স্ত্রী চব্বিশ ঘণ্টার নোটিশে নিউ ইয়র্কে হাজির হলাম। ব্রকলিন নামের শহরে আমার ছেলেমেয়েরা আমাদের জন্যে একটা এপার্টমেন্ট ভাড়া করে রেখেছে, সেখানে জিনিসপত্র রেখে বেলভিউ হাসপাতালে ছুটে গেলাম। প্রকাশক মাজহার আমাদের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে নিয়ে গেলেন, সেখানে তার স্ত্রী শাওনের সাথে দেখা হলো। ওর বিছানায় নানা ধরণের যন্ত্রপাতি হুমায়ূন আহমেদকে ঘিরে রেখেছে, তাকে ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। অবস্থা একটু ভালো হলে তাকে জাগিয়ে তোলা হবে।

আমরা প্রতিদিন কাকভোরে হাসপাতালে যাই, সারাদিন সেখানে অপেক্ষা করি, গভীর রাতে ব্রকলিনে ফিরে আসি। হুমায়ূন আহমেদকে আর জাগিয়ে তোলা হয় না। আমি এত আশা করে দেশ থেকে ছুটে এসেছি তার হাত ধরে চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলব, অভিমানের যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল মুহুর্তে সেই দূরত্ব দূর হয়ে যাবে কিন্তু সেই সুযোগটা পাই না। ইনটেনসিভ কেয়ারের ডাক্তারদের সাথে পরিচয় হয়েছে, ঘনিষ্ঠতা হয়েছে এতদিনে তারা বিছানায় অসহায়ভাবে শুয়ে থাকা মানুষটির গুরুত্বের কথা জেনে গেছে। তারা আমাকে বলল, ‘‘হুমায়ূন আহদেম ঘুমিয়ে থাকলেও তারা তোমাদের কথা শুনতে পায়। তার সাথে কথা বলো।’’ তাই যখন আশেপাশে কেউ থাকে না তখন আমি তার সাথে কথা বলি। আমি তাকে বলি দেশের সব মানুষ, সব আপনজন তার ভালো হয়ে ওঠার জন্যে দোয়া করছে। আমি তাকে মায়ের কথা বলি, ভাইবোনের কথা বলি, ছেলেমেয়ের কথা বলি। সে যখন ভালো হয়ে যাবে তখন তার এই চেতন-অচেন রহস্যময় জগতের বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে কী অসাধারণ বিই লিখতে পারবে তার কথা বলি। তার কাছে সবকিছু স্বপ্নের মতো মনে হলেও এটা যে স্বপ্ন নয় আমি তাকে মনে করিয়ে দিই, দেশ থেকে চলে এসে এখন আমি যে তার পাশে দাঁড়িয়ে আছি এটা যে সত্যি, সেটা তাকে বিশ্বাস করতে বলি।

ঘুমন্ত হুমায়ূন আহমেদ আমার কথা শুনতে পারছে কী না সেটা জানার কোনো উপায় নেই, কিন্তু আমি বুঝতে পারি সে শুনছে কারণ তার চোখ থেকে ফোটা ফোটা চোখের পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে। আমি অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকি।

একদিন হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে ছোট মেয়ে বিপাশা তার বাবাকে দেখতে এলো। যে কারণেই হোক বহুকাল তারা বাবার কাছে যেতে পারেনি। ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে সে যখন গভীর মমতায় তার বাবার পপালে হাত রেখে তাকে ডাকল, কানের কাছে মুখ রেখে ফিস ফিস করে কথা বলল আমরা দেখলাম আবার তার দুই চোখ থেকে ফোটা ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল। সৃষ্টিকর্তা আমাদের অনেক কিছু দিয়েছেন, মনে হয় সেজন্যেই এই দুঃখগুলো দিতেও কখনো কার্পণ্য করেননি।

১৯ জুলাই অন্যান্য দিনের মতো আমি হাসপাতারে গিয়েছি, ভোরবেলা হঠাৎ করে আমার মা আমাকে ফোন করলেন। ফোন ধরতেই আমার মা হাহাকাজর করে বললেন, ‘‘আমার খুব অস্থির লাগছে! কী হয়েছে বল।’’
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘‘কী হবে? কিছুই হয়নি। প্রত্যেকদিন যেরকম হাসপাতালে আসি আজকেও এসেছি। সবকিছু অন্যদিনের মতো; কোনো পার্থক্য নেই।’’ আমার মায়ের অস্থিরতা তবও যায় না, অনেক কষ্ট করে তাকে শান্ত করে ফোনটা রেখেছি ঠিক সাথে সাথে আমার কাছে খবর এলো আমি যেন এই মূহুর্তে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে যাই। হুমায়ূন আহমেদ মারা যাচ্ছে। আমি বিজ্ঞানের ছাত্র তথা কেমন করে পাঠানো সম্ভব তার তার সকল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আমি জানি। কিন্তু পৃথিবীর অপর পৃষ্ঠ থেকে একজন মা কেমন করে তার সন্তানের মৃত্যুক্ষণ নিজে থেকে বুঝে ফেলতে পারে আমার কাছে তার ব্যাখ্যা নেই।

আমি দ্রুত ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে গিয়েছি। হুমায়ূন আহমেদের কেবিনে সকল ডাক্তার ভিড় করেছে, তার চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা ড. মিলারও আছেন। আমাদের দেখে অন্যদের বললেন, ‘‘আপনজনদের কাছে যাবার ব্যবস্থা করে দাও।’’ আমি বুঝতে পারলাম হুমায়ূন আহমেদকে বাঁচিয়ে রাখার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এখন তাকে চলে যেতে দিতে হবে।

আমার স্ত্রী ইয়াসমিন আমাকে বলল, আমার মা’কে খবরটা দিতে হবে। ১৯৭১ সালে আমি আমার মা’কে আমার বাবার মৃত্যু সংবাদ দিয়ে তার সারাটা জীবন ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিলাম। এতদিন পর আবার আমি নিষ্ঠুরের মতো তাকে তার সন্তানের আসন্ন মৃত্যুর কথা বলব? আমি অবুঝের মতো বললাম, আমি পারব না। ইয়াসমীন তখন সেই নিষ্ঠুর দায়িত্বটি পালন করল- মূহুর্তে দেশে আমার মা-ভাইবোন সব আপনজনের হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে সব স্বপ্ন সব আশা এক ফুৎকারে নিভে গেল।

কেবিনের ভেতর উঁচু বিছানায় শুয়ে থাকা হুমায়ূন আহমেদকে অসংখ্য যন্ত্রপাতি বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে, তার কাছে শাওন দাঁড়িয়ে আকুল হয়ে ডেকে হুমায়ূন আহমেদকে পৃথিবীতে ধরে রাখতে চাইছে। আমরা বোধশক্তিহীন মানুষের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। যে তরুণ ডাক্তার এতদিন প্রাণপন চেষ্টা করে এসেছে সে বিষণ্ন গলায় আমাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করল, বল- ‘‘আর খুব বেশি সময় নেই।’’

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘ ও কী কষ্ট পাচ্ছে?’’ তরুণ ডাক্তার বলল, ‘‘ না কষ্ট পাচ্ছে না।’’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘তুমি কেমন করে জানো?’’ সে বলল, ‘‘আমরা জানি। তাকে আমরা যে ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছি তাতে তার কষ্ট হবার কথা নয়। এ নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। এরকম অবস্থা থেকে যখন কেউ ফিরে আসে তাদের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি।’’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘তার িএখন কেমন লাগছে?’’ সে বলল, ‘‘স্বপ্ন দেখার মতো। পুরো বিষয়টা তার কাছে মনে হচ্ছে একটা স্বপ্নের মতো।’’
একটু পরে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘যদি কোনো জাদুযন্ত্রবলে হঠাৎ সে জ্ঞান ফিরে পায়, হঠাৎ সে বেঁচে উঠে তাহলে কী সে আবার হুমায়ূন আহমেদ হয়ে বেঁচে থাকবে?’’ তরুণ ডাক্তার বলল, ‘‘এখন যদি জেগে উঠে তাহলে হবে, একটু পরে আর হবে না। তার ব্লাড প্রেশার দ্রুত কমছে, তার মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ কমছে, মস্তিষ্কের নিউরন সেল ধীরে ধীরে মারা যেতে শুরু করেছে।’’

আমরা সবাই স্তদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। কম বয়সী তরুণী একজন নার্স তার মাথার কাছে সব যন্ত্রপাতির কাছে দাঁড়িয়ে আছে। হুমায়ূন আহমেদের জীবনের শেষ মূহুর্তটি যেন কষ্টহীন হয় তার নিশ্চয়তা দেয়ার চেষ্টা করছে। চারপাশে ঘিরে থাকা যন্ত্রপাতিগুলো এতদিন তাকে বাঁচিয়ে রেখে যেন ক্লান্ত হয়ে গেছে, একটি একটি যন্ত্র দেখাচ্ছে খুব ধীরে ধীরে তার জীবনের চিহ্নগুলো মুছে যেতে শুরু করেছে। ব্লাড প্রেশার যখন আরো কমে এসেছে আমি তখন তরুণ ডাক্তারকে আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘ এখন? এখন যদি হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে উঠে তাহলে কী হবে?’’ ডাক্তার মাথা নেড়ে বলল, ‘‘যদি এখন অলৌকিকভাবে তোমার ভাই জেগে উঠে সে আর আগের মানুষটি থাকবে না। তার মস্তিস্কের মাঝে এর মাঝে অনেক নিউরন সেল মারা গেছে।’’

আমি নিঃশব্দে হুমায়ূন আহমেদকে এই পৃথিবী থেকে বিদায় জানালাম। তার দেহটিতে এখনো জীবনের চিহ্ন আছে কিন্তু আমার সামনে সে মানুষটি শুয়ে আছে। সে আর অসম্ভব সৃষ্টিশীল অসাধারণ প্রতিভাবান হুমায়ূন আহমে নয়। যে মস্তিষ্কটি তাকে অসম্ভব একজন সৃষ্টিশীল মানুষ করে রেখেছিল তার কাছে সেই মস্তিষ্কটি আর নেই। সেটি হারিয়ে গেছে।

তরুণ ডাক্তরি একটু পর ফিস ফিস করে বলল, ‘‘এখন তার হৃদ স্পন্দন অনিয়মিত হতে থাবে।’’ সত্যি সত্যি তার হৃদ স্পন্দর অনিয়মিত হতে থাকল। ডাক্তার একটু পর বলল, ‘‘আর মাত্র কয়েক মিনিট।’’
আমি বোধশক্তিহীন মানুষের মতো দাঁড়িয়েছিলাম। এবার একটু কাছে গিয়ে তাকে ধরে রাখলাম। যে যন্ত্রটিতে এতদিন তার হৃদ স্পন্দন স্পন্দিত হয়ে এসেছে, এটা শেষবার একটা ঝাঁকুনি দিয়ে রিদিনের মতো থেমে গেল। মনিটরে শুধু একটি সরলরেখা, আশ্চর্য রকম নিষ্ঠুর একটি সরলরেখা। হুমায়ূন আহমেদের দেহটা আমি ধরে রেখেছি কিন্তু মানুষটি চলে গেছে।

ছোট একটি ঘরের ভেতর কী অচিন্ত্যনীয় বেদনা এসে জমা হতে পারে আমি হতবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইলাম।

২.
আমি আর ইয়াসমিন ঢাকা ফিরেছি বাইশ তারিখ ভোরে। এয়ারপোর্ট থেকে বের হবার আগেই অসংখ্য টেলিভিশন ক্যামেরা আমাদের ঘিরে ধরল। আমি নূতন করে বুঝতে পারলাম হুমায়ূন আহমেদের জন্যে শুধু তার আপনজনেরা নয়, পুরো দেশ শোকাহত।

এরপরের কয়েকদিনের ঘটনা আমি যেটুকু জানি, এই দেশের মানুষ তার থেকে অনেক ভালো করে জানে। একজন লেখকের জন্যে একটা জাতি এভাবে ব্যাকুল হতে পারে আমি নিজের চোখে না দেখলে কখনো বিশ্বাস করতাম না। কোথায় কবর দেয়া হবে সেই সিদ্ধান্তটি শুধু আপনজনদের বিষয় থাকল না। হঠাৎ করে সেটি সারা দেশের সব মানুষদের আগ্রহের বিষয় হয়ে দাঁড়াল। টেলিভিশনের সব চ্যানেল একান্তই একটা পারিবারিক বিষয় চব্বিশ ঘণ্টা দেখিয়ে গেছে, এতদিন পরেও আমার সেটা বিশ্বাস হয় না। পরে আমি অনেককে প্রশ্ন করে বুঝতে চেয়েছি এটা কী একটা স্বাভাবিক বিষয় না কী মিডিয়াদের তৈরি করা একটা কৃত্রিম ‘‘হাইপ’’।
সবাই বলেছে এটি ‘‘হাইপ’’ ছিল না, দেশের সব মানুষ সারাদিন সারারাত নিজের আগ্রহে টেলিভিশনের সামনে বসেছিল। একজন লেখকের জন্যে এত তীব্র ভালোবাসা মনে হয় শুধু এই দেশের মানুষের পক্ষেই সম্ভব।

৩.
হুমায়ুন আহমেদ কি শুধু জনপ্রিয় লেখক নাকি তার লেখালেখির সাহিত্য মর্যাদাও আছে সেটি বিদগ্ধ মানুষের একটি প্রিয় আলোচনার বিষয়। আমি সেটি নিয়ে কখনও মাথা ঘামাইনি। কারো কাছে মনে হতে পারে দশ প্রজন্মের এক হাজার লোক একটি সাহিত্যকর্ম উপভোগ করলে সেটি সফল সাহিত্য! আবার কেউ মনে করতেই পারে তার দশ প্রজন্মের পাঠকের প্রয়োজন নেই, এক প্রজন্মের এক হাজার মানুষ পড়লেই সে সফল। আমি নিজেও যেহেতু অল্প বিস্তর লেখালেখি করি তাই আমি জানি একজন লেখক কখনই সাহিত্য সমালোচকের মন জয় করার জন্য লিখেন না, তারা লেখেন মনের আনন্দে। যদি পাঠকেরা সেই লেখা গ্রহন করে সেটি বাড়তি পাওয়া। হুমায়ুন আহমেদ এর লেখা মানুষ শুধু যে গ্রহণ করেছিল তা নয়, তার লেখা কয়েক প্রজন্মের পাঠক তৈরি করেছিল। বড় বড় সাহিত্য সমালোচকেরা তার লেখাকে আরালে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছেন কিন্তু ঈদ সংখ্যার আগে একটি লেখার জন্য তার পিছনে ঘুর ঘুর করেছেন সেটি আমাদের সবার জন্য একটি বড় কৌতুকের বিষয় ছিল। কয়েক দিন আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনী সংস্থার কর্ণধারের সাথে কথা হচ্ছে, কথার ফাকে একবার জিজ্ঞেস করলাম “আপনাদের কাছে কি হুমায়ুন আহমেদ এর কোন বই আছে?”

প্রশ্নটি শুনে ভদ্রলোকের মুখটি কেমন যেন ম্লান হয়ে গেল। দুর্বল গলায় বললেন, হুমায়ুন আহমেদ যখন প্রথম লিখতে শুরু করেছে তখন সে তার একটি উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি নিয়ে তাদের প্রকাশনীতে এসেছিল। তাদের প্রকাশনীতে বড় বড় জ্ঞানী-গুণী মানুষ নিয়ে রিভিউ কমিটি ছিল, পাণ্ডুলিপি পড়ে রিভিউ কমিটি সুপারিশ করলেই শুধু মাত্র বইটি ছাপা হতো। হুমায়ুন আহমেদ এর উপন্যাসটি পড়ে রিভিউ কমিটি সেটাকে ছাপানোর অযোগ্য বলে বাতিল করে দিল। প্রকাশনাটি তাই সেই পাণ্ডুলিপি না ছাপিয়ে হুমায়ুন আহমেদকে ফিরিয়ে দিয়েছিল!

গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনীটির কর্ণধারের মুখ দেখে আমি টের পেয়েছিলাম তিনি তার প্রকাশনীর রিভিউ কমিটির সেই গুণী সদস্যদের কোনোদিন ক্ষমা করেননি। করার কথা নয়।

হুমায়ুন আহমেদ তিন শতাধিক বই লিখেছে, তার উপরও গত বছর সম্ভবত প্রায় সমান সংখ্যক বই লেখা হয়েছে। কত বিচিত্র সেই বইয়ের বিষয়বস্তু। তার জন্য গভীর ভালবাসা থেকে লেখা বই যে রকম আছে ঠিক সে রকম শুধু মাত্র টু-পাইস কামাই করার জন্য লেখা বইয়ের অভাব নেই। লেখক হিসেবে আমাদের পরিবারের কারো নাম দিয়ে গোপনে বই প্রকাশ করার চেষ্টা করা হয়েছে, শেষ মুহূর্তে থামানো হয়েছে এমন ঘটনাও জানি। হুমায়ুন আহমেদ চলে যাওয়ার পর মানুষের তীব্র ভালবাসার কারনে ইন্টারনেটে নানা ধরনের আবেগের ছড়াছড়ি ছিল, সে কারনে মানুষ জন গ্রেপ্তার পর্যন্ত হয়েছে, হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে ছাড়াও পেয়েছে। তার মৃত্যু নিয়ে নানা ধরনের জল্পনা কল্পনা আছে কাজেই কোন কোন বই যে বিতর্কের জন্ম দেবে তাতেও অবাক হবার কিছু নেই। তাই আমি যখন দেখি কোন বইয়ের বিরুদ্ধে গুণী মানুষেরা বিবৃতি দিচ্ছেন, সেই বই নিষিদ্ধ করার জন্য মামলা মোকদ্দমা হচ্ছে আমি একটুও অবাক হইনা। শুধু মাঝে মাঝে ভাবি হুমায়ুন আহমেদ যদি বেঁচে থাকত তাহলে এই বিচিত্র কর্মকাণ্ড দেখে তার কি প্রতিক্রিয়া হতো?

কেউ যেন মনে না করে তাকে নিয়ে শুধু রাগ দুঃখ ক্ষোভ কিংবা ব্যাবসা হচ্ছে, আমাদের চোখের আড়ালে তার জন্য গভীর ভালোবাসার সামনে ভিন্ন একটা জগত রয়েছে। আমি আর আমার স্ত্রী ইয়াসমিন যখন হুমায়ুন আহমেদ এর পাশে থাকার জন্য নিউইয়র্ক গিয়েছিলাম তখন একজন ছাত্রের সাথে পরিচয় হয়েছিল। সে হুমায়ুন আহমেদ এর সেবা করার জন্য তার কেবিনে বসে থাকতো। শেষ কয়েক সপ্তাহ যখন তাকে অচেতন করে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হল তখনও এই ছেলেটি সারারাত হাসপাতালে থাকতো। হুমায়ুন আহমেদ যখন আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে তখন সে আমাদের সাথে ছিল। সেই দিন রাতে এক ধরনের ঘোর লাগা অবস্থায় আমরা যখন নিউইয়র্ক শহরের পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছি তখনও এই ছেলেটি আমাদের সাথে হেঁটে হেঁটে গেছে।

দেশে ফিরে এসে মাঝে মাঝে তার সাথে আমাদের যোগাযোগ হয়। শেষ বার তার সাথে যখন যোগাযোগ করা হয়েছে সে বলেছে এখনও মাঝে মাঝে সে বেলভিউ হাসপাতালে গিয়ে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে বসে থাকে।
কেন বসে থাকে আমি জানি না। আমার ধারণা সে নিজেও জানে না। শুধু এই টুকু জানি এই ধরনের অসংখ্য মানুষের ভালবাসা নিয়ে হুমায়ুন আহমেদ আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।

মনে হয়, এই ভালবাসাটুকুই হচ্ছে জীবন।

উৎস:সহায়ক