১২৮৬ বঙ্গাব্দ, রবীন্দ্রনাথ প্রথমবার বিলেতে যাচ্ছেন। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে একটি কবিতা লিখে পাঠালেন। কবিতার প্রথম চারটি পঙিক্ত:
বিলাতে পালাতে ছটফট করে নব্য গৌড়ে,
অরণ্যে যে জন্যে গৃহগবিহগপ্রাণ দৌড়ে।
স্বদেশে কাঁদে সে, গুরুজনবশে কিছু হয় না—
চিহ্ন হ্যাট্টা কোট্টা ধুতি পিরহণে মান রয় না।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘বিলাতফের্তা’র শেষ চারটি পঙিক্ত একই সঙ্গে স্মর্তব্য:
আমরা সাহেবি রকমে হাঁটি
স্পীচ দেই ইংরেজি খাঁটি
কিন্তু বিপদেতে দেই বাঙ্গালির মত
চম্পট পরিপাটি।

কেবল দুই দ্বিজেন নন, বাঙালির ইংরেজ ও ইংরেজি প্রীতি নিয়ে সেকালের বুদ্ধিজীবীদের বড় অংশই ঠাট্টামশকরা করেছেন। তার পরও ইংরেজি চর্চা করে গেছেন অনেকে। ইংরেজিতে লিখে এরই মধ্যে বিশ্বসাহিত্যের খিড়কি দুয়ার ঠেলে পশ্চিমবঙ্গের কজন লেখক বিশ্বসভায় পরিচিতি লাভ করছেন। বাংলাদেশও এগোচ্ছে। এবারের (মে-জুন ২০১৩) ওয়ার্ল্ড লিটারেচার টুডের প্রচ্ছদ কাহিনি বাংলাদেশি লেখকদের ইংরেজি রচনা—বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ।

ড্যানিয়েল সাইমন সম্পাদিত ওয়ার্ল্ড লিটারেচার টুডে ওকলাহোমা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দ্বিমাসিক প্রকাশনা। ১৯২৭ থেকে এটি নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে। চলতি সংখ্যার প্রচ্ছদ দখল করে আছে বাংলাদেশের তাহমিমা আনামের ছবি।
সূচনা নিবন্ধে ডেভিড শুক বাংলা সাহিত্যের দুই প্রধান আইকন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের কথা বলেছেন। মাতৃভাষার প্রতি বাঙালির অনুরাগ ও আনুগত্য এবং ভাষা প্রশ্নে রক্তঝরা আন্দোলনের কথা বলেছেন।

উপমহাদেশীয় ইংরেজি সাহিত্যের সুফলা দিনগুলোতে বাংলাদেশের প্রবেশ ঘটেছে বিলম্বে। ওয়ার্ল্ড লিটারেচার টুডের চলতি সংখ্যাটিকে ‘শোকেস অব কনটেম্পরারি বাংলাদেশি লিটারেচার’ বলা হলেও কার্যত তা হতে পারে সমকালীন ইংরেজি লিখিয়ে বাংলাদেশি সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্মের শোকেস।
ডেভিড শুক চারজন বাংলাদেশি লেখকের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: তাহমিমা আনাম, ফারাহ গজনবী, মাহমুদ রহমান এবং কাজী আনিস আহমেদ। বিশ্বসাহিত্যের মঞ্চে বাংলাদেশের বিলম্বিত আগমনের কারণ এবং অনুবাদের সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে তাঁরা মতামত দেন। আলোচনা করেন হে উৎসব নিয়ে।
কাজী আনিস আহমেদের দ্য ওয়ার্ল্ড ইন মাই হ্যান্ডস উপন্যাসের একাংশ মুদ্রিত হয় এই সংখ্যায়। এ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট রাজনৈতিক সংকটে অস্থিতিশীল দক্ষিণ এশীয় পান্ডুয়া অঞ্চল।
সুদীপ্ত চাকমা মিকাদোর দুটি চাকমা কবিতার ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে পত্রিকাটিতে।
মারিয়া চৌধুরীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাভিত্তিক রচনা ‘বিচ্ছিন্নতার তিন অধ্যায়’ বেশ সুখপাঠ্য।
‘বাংলাদেশি হয়ে ইংরেজিতে লেখালেখি শুরু করাটা কি একধরনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত?’ এমন প্রশ্নের জবাবে ফারাহ গজনবী ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং নিজের বেড়ে ওঠার বর্ণনা দিয়ে দেখিয়েছেন, সিদ্ধান্তটি আসলে রাজনৈতিক।
মাহমুদ রহমান ভাষা আন্দোলনকে সামনে এনে বলেছেন, তার পরও তখন বাংলাদেশে এমনকি রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ পুলিশের ডিটেকটিভ নামের ইংরেজি সাময়িকীটি নিয়মিত গল্প ও কবিতা প্রকাশ করত।
কাজী আনিস আহমেদ কসমোপলিটান সংস্কৃতি লালনের ওপর জোর দিয়েছেন, এই মুহূর্তে এমনকি পুরস্কারপ্রাপ্ত বাঙালি লেখকদেরও কেউ কেউ যে ইংরেজি পাঠে স্বস্তি বোধ করেন না এবং তাঁদের কারও কারও বিশ্বসাহিত্যপাঠ যে সামান্যই, তা নির্দ্বিধায় বলেছেন।
মাহমুদ রহমান বলেন, বাংলায় অনূদিত বিদেশি সাহিত্যের অনুবাদ মান ‘ইভেন পুওরার’—এমনকি আরও দৈন্যদশাগ্রস্ত। হালে ওরহান পামুকের মাই নেম ইজ রেড এর একটি অনুবাদ পড়তে গিয়ে কেবলই মনে হয়েছে, অনুবাদক যদি অন্তত একটি অভিধান হাতে নিয়ে অনুবাদকর্মটি করতেন! অনুবাদের সাহিত্যমানের কথা বাদই যাক।
তাহমিমা আনামের ভাষ্য, হারপারকলিন্স, পেঙ্গুইন, র্যানডম হাউস, ব্লুমসবারি ও অন্যান্য প্রকাশকেরা বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ অকার্যকর হয়ে পড়ে, কারণ তাঁদের লেখক তালিকায় বাংলাদেশের কোনো লেখক নেই। প্রকাশকেরা বলে যাচ্ছেন, ‘আপনাদের পাণ্ডুলিপি পাঠান, আমরা প্রকাশ করব।’ খাদেমুল ইসলাম ইতিমধ্যেই চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন ব্লমসবারির সঙ্গে। আমি নিশ্চিত অচিরেই তাঁর বই প্রকাশিত হবে এই প্রকাশনী থেকে।
যেখানে বাংলাভাষী ইংরেজি লিখিয়ে অমিতাভ ঘোষ নোবেল পুরস্কারের জন্য প্রস্তাবিত হচ্ছেন, সেখানে বাংলাদেশের ইংরেজি লিখিয়ে কবি ও কথাসাহিত্যিকেরাও যে ধীরে হলেও উঠে আসছেন, এটা অবশ্য আশার কথা।

উৎস:সহায়ক