বিরোধীদল তো ছিলই না। বিরোধীদলীয় পত্রপত্রিকাগুলোকেও নির্মমভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। সরকার সমর্থক পত্রিকাসমুহ এবং সরকারের অন্য দুটো অংগদলের মুখপত্রগুলো প্রতিটি স্বৈরাচারী পদক্ষেপকে একেবারে নির্লজ্জভাবে অভিনন্দিত করে যাচ্ছিল। তথাপি শেখ মুজিবুর রহমান একদলীয় শাসন কায়েম করার প্রাক্কালে বাংলাদেশে পত্র-পত্রিকার সংখ্যা একেবারে কমিয়ে এনে গণমতের বাহনগুলোর কর্তৃত্ব নির্ভরযোগ্য হস্তে অর্পণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র চারটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হবে ঠিক হল। দুটি বাংলা এবন দুটি ইংরেজি এবং এটাও ঠিক হল যে বাদ বাকি পত্রিকাসমুহ বন্ধ করে দেয়া হবে। “ইত্তেফাক” কাগজটিকে পুরোপুরিভাবে সরকারি নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসা হল। “ইত্তেফাক” ছাড়া অপর যে বাংলা কাগজটি বেঁচে থাকবে সেটির নাম “দৈনিক বাংলা”।

ইংরেজি কাগজ দুটির নাম “বাংলাদেশ অবজারভার” এবং “বাংলাদেশ টাইমস”।

এসব পত্রিকাগুলো একেবারে সরকারি পত্রিকা এবং সাংবাদিকেরা সরকারি কর্মচারীরুপে চিহ্নিত হবেন বলে ঘোষনা দেয়া হল।


একসংগে অনেকগুলো পত্রপত্রিকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে গোটা দেশের সাংবাদিকবৃন্দ এক ভয়াবহ সংকটে নিপতিত হন। এই নির্মম অর্তসংকটের দিনে সাংবাদিকেরা সবান্ধবে বেকার হয়ে পড়ার ফলে তাঁদের সামনে বেঁচে থাকার দ্বিতীয় কোন পন্থা উম্মুক্ত রইল না। যে চারটি পত্রিকা প্রকাশিত হবার সিদ্ধান্ত পাকাপাকি হয়ে গেছে, সেগুলোতে কোনো রকমে স্থান করে নেয়ার জন্য প্রতিটি সাংবাদিকই মরিয়া হয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। এই ধরনের পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের কাছ থেকে এর চেয়ে ভিন্ন কোন আচরন আশাও করা বোধহয় সম্ভব ছিলনা। অবশ্য শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার তাঁদের কর্মসংস্থান করে দেবেন বলে প্রতিশ্রুতিও দান করেছিলেন এবং সরকার থেকে তাঁরা অল্প-স্বল্প মাইনেও পাচ্ছিলেন। এই অনিশ্চিত শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে সাংবাদিকদের মাথায় যে চিন্তাটা প্রথমে এসেছিল তাতে বাহ্যত দাসোচিত আত্মসমর্পন এবং সুবিধাবাদি চরিত্রের পরিচয় স্পষ্টতভাবে ফুটে উঠলেও বাংলাদেশের পরিস্থিতির বিচারে তাই-ই ছিল একান্ত বাস্তব এবং যুক্তিসংগত। প্রতিটি আলাদা আলাদা পত্রিকার সাংবাদিকেরা ভাবলেন তারা আগেভাগে যদি সরকারি দলে যোগ দেয়ার আবেদনপত্রে সই দিয়ে বসেন, সরকার অনুকম্পা করে তাঁদের কথাটি বিবেচনা করে দেখবেন। এই ধরনের মনোভাবের বশবর্তী হয়ে যাবার বেশ কয়েকদিন পূর্বে “দৈনিক পূর্বদেশ” পত্রিকার সাংবাদিকবৃন্দ সদলবলে বাকশালের কেন্দ্রীয় দফতরে গমন করে সই করা আবেদনপত্রসমুহ জমা দিয়ে এসে মনে করলেন, যা্ক্‌ নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। এই ঘটনার পর থেকে অন্যান্য চালু এবং বাতিল পত্রিকার কর্রমরত সাংবাদিকদেরও বোধদয় ঘটল। তাঁরা ভাবলেন, পূর্বদেশের সাংবাদিকদের মত তাঁরাও যেয়ে যদি বাকশালের সদস্যপদের আবেদনপত্রে সই না করেন, তাহলে তাদের চাকুরি হবে না এবং চালু পত্রিকায় কর্মরত থাকলে চাকুরিটি টিকবে না। সরকারি পত্রিকায় সরকারিদলের লোকদের কাজ পাবার নৈতিক দাবীই সবচেয়ে বেশী। তারপর থেকে সাংবাদিকেরা দিগ্বিদিক জ্ঙান হারিয়ে দল বেঁধে নিয়মিত বাকশাল অফিসে ধাওয়া করতে থাকলেন। প্রতিটি পত্রিকার সরকারসমর্থক সাংবাদিকেরা উদ্যোগী হয়ে সহযোগী এবং কলাকুশলীদের টেনে নিয়ে জাতীয় দলের অফিসে হাজিরা দিতে আরম্ভ করলেন। রাস্ট্রের তৃতীয় স্তম্ভ বলে কথিত সংবাদপত্রের কারিগরদের একাংশ পেশাগত মর্যাদা, স্বাধীনতাস্পৃহা, সত্য এবং ন্যায় – সাংবাদিকতাবৃত্তির সংগে সংস্লিষ্ট ইত্যাদি মহত অনুষংগসমুহ বাদ দিয়ে যে নাটকের অবতারনা করেছিলেন বাংলাদেশের সমাজে অনতিবিলম্বে তার প্রভাব অনুভুত হতে শুরু করে। অবশ্য সাংবাদিক মাত্রেই যে বাকশালে যোগ দেয়ার জন্য লালায়িত ছিলেন তেমন কথা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। চাপের মুখে বাকশাল সদস্যপদের আবেদনপত্রে সই করে একজন সাংবাদিককে আমি সত্যি সত্যি নিজের চোখে কাঁদতে দেখেছি। বেশ ক’জন সাংবাদিক ভয়ভীতি অগ্র‌াহ্য করে শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতার আদর্শ এবং নীতিতে অটল ছিলেন। “ইত্তেফাক” পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক জনাব আসাফউদ্দৌলা রেজা আবেদনপত্রে সই করেননি। এই অভিযোগে সরকারি ব্যবস্থাপনায় “ইত্তেফাক” প্রকাশ পাওয়ার সময় তাঁর চাকরি চলে যায়।

বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের সভাপতি ঘোষনা করেছিলেন যে আমলা, কর্মরত সাংবাদিক, স্বায়ত্বশাসিত এবং আধা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানসমুহের কর্মচারীবৃন্দ, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক যে কেউ বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের সদস্যপদের জন্য আবেদন করতে পারবেন। অবশ্য কাকে সদস্যপদ দেয়া হবে, কাকে হবে না সটি সম্পুর্নভাবে কর্তৃপক্ষের বিবেচনার বিষয়।
যে কেউ ইচ্ছে করলে সরকারি দলে যোগদান করতে পারবে, এটা ছিল সরকারি ঘোষনা। আসলে যোগ না দিলে কারো নিস্তার পাবার উপায় ছিলনা। ভেতরে ভেতরে সমস্ত সরকারি বেসরকারি দফতর স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পত্রিকার সাংবাদিক, লেখক, কবি, সাহিত্যিক এবং বুদ্ধিজীবীদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে যাচ্ছিলেন যে, সবাইকে জাতীয়দলে যোগ দেয়ার আবেদনপত্রে সই করতে হবে। কতৃপক্ষ যাকে বিপজ্জনক মনে করেন সদস্যপদ দেবেন না, কিন্তু বাংলাদেশে বাস করে চাকুরি-বাকরি, ব্যাবসা-বানিজ্য করে বেঁচে-বর্তে থাকতে চাইলে জাতীয়দলের সদস্যপদের আবেদনপত্রে সই করতেই হবে। সর্বত্র বাকশালে যোগদান করার একটা হিড়িক পড়ে গেল। শেখ মুজিবুর রহমান যেদিন আনুস্ঠানিকভাবে বাকশালের কেন্দ্রীয় দফতর উদ্বোধন করতে এলেন তাঁকে স্বাগত সম্ভাষন জ্জাপনের উদ্দেশ্যে গোটা দেশের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, শ্রমিক, কৃষক সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে হাজির থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল। সেদিন ছিল মুষলধারে বৃষ্টি। অবিরাম ধারাস্রোতে প্লাবিত হয়ে ভেজা কাকের মত সুদীর্ঘ মানুষের সারি কিভাবে রাস্তায় তাঁরা অপেক্ষা করছিলেন, যাঁরা এ দৃশ্য দেখেছেন ভুলবেন না। মহিলাদের গাত্রবস্ত্র ভিজে শরীরের সংগে একশা হয়ে গিয়েছিল। এই সুবিশাল জনারন্যে আমাদের দেশের নারীকুলকে লজ্জা-শরম জলান্জলি দিয়ে সশংকিতচিত্তে তাঁর আগমনের প্রতীক্ষা করতে হচ্ছিল।

নাগরিক জীবনের সর্বত্র একটা আতন্কের কৃষছায়া প্রসারিত করে আসছিল। এ ধরনের চিন্তা, বুদ্ধি এবং সাহসরোধী পরিবেশে যেখানে মানুষের বিচার-বুদ্ধি কাজ করে না, বেঁচে থাকা বলতে শুধু বোঝায় কোন রকমে পশু অস্তিত্বের সংরক্ষণ। নৈতিক সাহস, মানবিক মুল্যবোধ ইত্যাকার সুসভ্য জীবনের বোধগুলো বাংলাদেশে সর্বপ্রকারের কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছে। সবখানে আতন্ক, উদ্বেগ। এ তো গেল একদিকের চিত্র। অন্যদিকে গ্রাম-বাংলার মানুষদের অবস্থা দুর্দশার শেষ প্রান্তে এসে উপনীত হয়েছে। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্রের দাম প্রতিদিন হু হু করে বাড়ছে। দেশে অভাব, দুর্ভিক্ষ, মহামারী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ক্ষুধার তাড়নায় মা সন্তান বিক্রি করছে। স্বামী স্ত্রীকে পরিত্যাগ করছে। বিনা কাফনে লাশ কবরে নামছে। সৎকারবিহীন অবস্থায় লাশ শৃগাল-কুকুরের আাহার্য হওয়ার জন্য পথে পথে পড়ে থাকছে। চারদিকে জ্বলন্ত বিভীষিকা, চারদিকে হা-অন্ন, হা-অন্ন রব। এই অন্নহীন বস্ত্রহীন মানুষের দংগল একমুঠো ভাত, এক ফোটা ফেনের আশায় ঢাকা শহরে এসে শহরের ফুটপাতে চিৎ হয়ে মরে থাকছে।

একদিকে উদ্ধত উলংগ স্বৈরাচার, অন্যদিকে নির্মম দারিদ্র, বুভুক্ষা এই দুইয়ের মাঝখানে বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে অতি কষ্টে, অতি সন্তর্পনে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হচ্ছিল। অর্থনৈতিক অন্তর্দাহের আঁচ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতেও লেগেছে। অনেকগুলো পরিবার মাছ-মাংস স্পর্শ করা বাদ দিতে বাধ্য হয়েছে। কোনো কোনো পরিবারের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে। যারা দু’বেলা ভাত খেত দু’বেলা আাটা খেয়ে জীবন কাটাচ্ছে। আবার অনেক পরিবারের দু’বেলা আটাও জোটে না।

অথচ শেখ মুজিবুর রহমানের শাসন ক্ষমতার সংগে যাঁরা যুক্ত তাঁদের সুযোগ-সুবিধের অন্ত নেই। তাঁদের হাতে টাকা, ক্ষমতা সবকিছু যেন স্বাভাবিক নিয়মে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। আইন তাঁদের ধন-সম্পদ বৃদ্ধির সহায়, সরকারি আমলারা আ্জ্গাবহ মাত্র, সামাজিক সুনীতি, ন্যায়-অন্যায়, নিয়ম-কানুন কোন কিছুর পরোয়া না-করলেও তাঁদের চলে। উনিশ শ’ একাত্তুর সালের যুদ্ধের পর থেকে এই শ্রেণীটি বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক নৈরাজ্যের থেকে প্রাণরস সংগ্রহ করে ডাঁটো হয়ে মাথা তুলছিল। ঢাকা শহরের প্রশস্ত রাজপথ থেকে শুরু করে সরকারি দপ্তর, স্বায়ত্বশাসিত প্রতিস্ঠান, ব্যাবসায়ীর আড়ত, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, রেডিও-টেলিভিশন, লেখক-সাহিত্যিকদের আড্ডা, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মন্দির এমনকি দূর-দুরান্তের পল্লীগ্রামের মহল্লায় মহল্লায় এই হঠাৎ জন্মানো নব্যনবাবদের সীমাহীন প্রতিপত্তি। এদের অনুমোদন ছাড়া মরণোম্মুখ রোগী এক ফোটা ওষুধ পেত না, শীতার্ত উলংগ অসহায় মানুষের পরনে রিলিফের একখানি বস্ত্র উঠত না, এক সের রেশনের চাল কি আটা বিলি হতে পারত না। বিধ্ধস্ত বাংলাদেশের জনগনের সাহায্যার্থে যে দেশ থেকেই সাহায্য আসুক না কেন এই শ্রণীটির দুষ্ট ক্ষুধার চাহিদা মিটাতে সবকিছু শেষ হয়ে যেত। এদের অনুমোদন ছাড়া কোন অফিসে একজন সামান্য পিয়নের নিয়োগপত্র পাওয়ার সম্ভাবণা ছিল না, যোগ্যতা যাই হোক না কেন। রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করানো যেত না। ছাত্রকে স্কুলে। বেবাক দেশের দশদিকে এরা ছড়িয়েছিল। আমলাদের মধ্যে, নিম্নশ্রেণীদের মধ্যে, শিক্ষকদের মধ্যে, গায়ক-শিল্পী-সাহিত্যিকদের মধ্যে, কৃষক-শ্রমিকদের মধ্যে অন্তরীক্ষে অবস্থান করে একজন মাত্র মানুষ সবকিছুর সুতো ধরে রয়েছেন তিনি বাংলাদেশের রাস্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান।

স্বাধীনতার তিন বছর সময়ের মধ্যে সার্বিক পরিস্থিতি এরকম হয়ে দাঁড়িয়েছে যে বাংলাদেশ এবং শেখ মুজিব এ দুটো শব্দ পরস্পরের পরিপুরক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শেখ মুজিব যদি বলতেন আমিই হলাম গিয়ে বাংলাদেশ, তাহলে তিনি এতটুকুও মিথ্যে বলতেন না। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর দেশে ফিরে ক্ষমতার সিংহাসনে অধিষ্টিত হয়ে একে একে বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর গলা টিপে ধরেছিলেন। বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোকে তিনি নিষিদ্ধ ঘোষনা করেছেন। তাদের ঘরবাড়ি ভূ-সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছেন, পরিবার-পরিজনের ওপর সীমাহীন অত্যাচার চালিয়েছেন। তাদের কাউকে গ্রেফতার করে কারাগারের উদরে নিক্ষেপ করেছেন। দেদার নেতা এবং কর্মী হত্যা করেছে রক্ষীবাহিনী। বাংলাদেশের গ্রামে-গন্জে বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী দমন করার নামে সরল মানুষদের পাখির মত গুলি করে, গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। শেখ মুজিব বিরোধী কোন কিছুর আভাস পাওয়ামাত্রই রক্ষীবাহিনী আগ্নেয়াস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে ছুটে গেছে। সবকিছু জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে, ভেংগে-চুড়ে তছনছ লন্ড-ভন্ড করে দিয়েছে। পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির নেতা তিরিশ বছর বয়স্ক সিরাজ সিকদারকে নৃশংসভাবে হত্যা করিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান পরিষদ কক্ষে উল্লসিত উদ্‌ঘোষনায় ফেটে পড়ে বলেছিলেন, এখন কোথায় সিরাজ সিকদার? গ্রফতার, নির্যাতন এসব শেখ মুজিব প্রশাসনের একটা অ্ত্যন্ত উল্লেখযোগ্য দিক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আবদুল মতিন, আলাউদ্দিন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি মেজর জলিল, সম্পাদক আ.স.ম. আবদুর রব সহ অসংখ্য নেতা এবং কর্মী, জাতীয় লীগের অলি আহাদ অনেককেই তিনি কারাগারে প্রেরণ করেছিলেন। বিপ্লবী মতাদর্শী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং কর্মীদের কথা বাদ দিয়েও তিনি উদারনৈতিক গণতান্ত্রিকবোধ আস্থাশীল রাজনৈতিক দলগুলোর উপস্থিতিও বরদাশত করতে পারতেন না।

পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে ফেরার পর তিনি দেশের বিপর্যস্ত অবস্থার উন্নয়ন সাধনের জন্য সময়ে অসময়ে হুন্কার দেয়া ছাড়া কোনো বাস্তব কর্মপন্থা গ্রহণ করেননি। পক্ষকান্তরে তার বিরোধীদের সমুলে বিনাশ করার এক সর্বনেশে খেলায় মেতে উঠেছেন। এমনকি সে বিরোধিতা নিজের দলের লোক থেকে এলেও এবং একান্ত ন্যায়সংগত হলেও তিনি সহ্য করেননি। দৃশ্যত বিরোধীদলবিহীন খোলা ময়দানের তিন তিনটি দলের সর্বময় কর্তা হওয়া স্বত্তেও তিনি নিশ্চিত বোধ করতে পারছিলেন না। তিনটি দলকে এক করে একদলীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করে সমস্ত ক্ষমতা নিজের হাতে কুক্ষিগত করে রাখার জন্য রাতারাতি প্রধানমন্ত্রী থেকে রাস্ট্রপতি হয়ে বসলেন। সংবিধান বাতিল ঘোষনা করলেন। জাতীয় পরিষদের সদস্যদের সংগে বয়-বেয়ারাদের মত আচরন করলেন। উদারনৈতিক গণতন্ত্রে বিশ্বাসী শেখ মুজিব গণতান্ত্রিক আওয়ামী লীগ দলের পাটাতনে দাঁড়িয়েই একটি নির্দিষ্ট সময়ের পরিসরে নিজেকে বাঙালি জাতির সংগ্রামী প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করে নিতে পেরেছিলেন এবং বাঙালি জাতির মুক্তি-সংগ্রামের নায়করুপে সারাবিশ্বে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। তিন বছর যেতে না যেতেই আওয়ামী লীগ দলটির অস্তিত্ব বিলীন করে দিলেন। উনিশ শ’ উনসত্তর সালের পর থেকে এ পর্যন্ত তাঁকে ভাগ্যদেবতা অযাচিতভাবে কৃপা করে আসছে। উনিশ শ’ উনসত্তর সালে আইয়ুব বিরোধী অভ্যূথ্থানের ফলে আইয়ুব খানকে আগরতলা ষড়যণ্ত্র মামলে উঠিয়ে নিতে হয়। কারাগার থেকে তিনি বেরিয়ে আসেন বাঙালি জাতীর জনক এবং অদ্বিতীয় নেতা হিসেবে। তাঁর প্রতি জনগনের আস্থা ভালবাসা তাঁর মস্তকে হিমালয় পর্বতের চুড়োর মত উত্তুংগ মহিমায় বিভুষিত করেছে। গোটা জাতি তাঁর পেছনে। এর পূর্বে কোন বাঙালি নায়কের পেছনে মানুষ অকৃত্ত্রিম আস্থা এবং স্বত:স্ফুর্ট ভালাবাসা এমন করে বিলিয়ে দেয়নি। তার আগেও এরকমটি ঘটেছে বারবার। যে-কোন বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপ্লব, উপবিপ্লব শুরু হওয়ার পূর্বে শেখ মুজিব কোন যাদুমন্ত্র বলে কারাগারে ঢুকে পড়েছেন। ঘটনার নিয়মে ঘটনাটি ঘটে যাবার পর বিজয়ী বীরের মত শেখ সাহেব দৃপ্ত পদক্ষেপে প্রকাশ্য সূর্যালোকে বেরিয়ে এসে নেতার আসনটিতে বিনাদ্বিধায় বসে পড়েছেন। শেখ মুজিবকেই ঘটনাটির নায়ক বলে লোকে বিনাদ্বিধায় মেনে নিয়েছেন। তাঁর নিজের দলের মধ্যেও এ নিয়ে বোধকরি কোন প্রশ্ন কখনো উঠেনি। উনিশ শ’ একাত্তর সালের পঁচিশে মার্চ তারিখে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁকে আপন বাসভবন থেকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল এবং উনিশ শ’ বাহাত্তর সালের দশই জানুয়ারি তারিখে বাংলাদেশে এসে এমন একটি আসন পেয়ে গেলেন, বাঙালি জাতির ইতিহাসে কোন মানুষ সে রকম মর্যাদা, ভালোবাসা এবং একছ্ত্র ক্ষমতার আসনে উপনিবেশ করতে পারেনি। তাঁর তেজ, বীর্য এবং বাক্যের মন্ত্রশক্তিতে বিস্ময়াবিশ্ট দেশবাসী বহুকাল পূর্বেই তাঁকে বংগবন্ধু এবং বাঙালি জাতির পিতা ইত্যাদি দুর্লভ সম্মানে ভূষিত করেছিলেন। শ্রদ্ধা এবং ভালবাসার আসনে তো তিনি রাজচক্রবর্তী হিসেবে বহুকাল পূর্বে থেকেই আসীন ছিলেন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে বাঙালি হ্রদয়ের সিংহাসনের রাজা বাস্তবের সিংহাসনে আরোহন করলেন।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতি তাঁর দু:শাসনে যতই বিপর্যয়ের শেষ সীমানায় নেমে আসুক-না কেন, বন্যা, মহামারী, চোরাচালানী, ছিনতাইকারী, টাউট, স্বজনতোষনকারীরা বাংলাদেশে যে অবর্ননীয় দু:খ-দুর্দশারই সৃষ্টি করুক-না কেন তাঁর গোচরেই সবকিছু ঘটে আসছিল। যৌবনবতী মেয়ে মানুষ তার প্রেমিককে যে রকম বিশ্বাস করে এবং ভালবাসে, বাংলাদেশের মানুষ তাঁকে সেই অকৃত্তিম অন্তরের অন্ত:স্থল থেকে উৎসারিত বিশ্বাস এবং ভালাবাসা দিয়েছিল। তিনি এলেন, প্রধাণমন্ত্রী হলেন। নতুন সংবিধান রচনা করলেন, নির্বাচন ডাকলেন এবং নির্বাচিত হওয়ার পর বছর না ঘুরে না-আসতেই প্রধাণমন্ত্রীর পদ তাঁর হল না। তাঁরই নির্দেশে রচিত সংবিধানের বিধানগুলো আঁটোসাটো জামার মত ক্রমাগত তাঁর বিরক্তি উৎপাদন করছিল। তাই তিনি নিজ হাতে গড়া অনুশাসনের নিগড় ছিন্ন করে ফেললেন। সংবিধান বাতিল ঘোষনা করলেন। যে সংসদীয় গনতন্ররে বাঁধানো সড়ক বেয়ে আকাশস্পর্শী উচ্চকাঙখার নির্দেশে একটি সবল, স্বাস্থ্য এবং দরাজ কন্ঠস্বর মাত্র সম্বল করে এতদুর উর্ধ্বে আরোহন করেছেন সেই সংসদীয় গণতণ্ত্র শেখ মুজিবের হাতেই জখম হয়ে হয়ে লাশটি তাঁরই হাতে কবরস্থ হওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করছিল। অবিলম্বে তিনি তাঁর কর্তব্যকর্ম সমাপন করলেন। সংসদীয় গনতণ্ত্রের লাশটি কবর দিলেন। একদলীয় সরকারের রা্স্ট্টপতি হিসেবে নতুন পরিচয়ে তিনি নিজেকে পরিচিত করলেন। শেখ মুজিব যা করেন সব নিঁখুত। ইতিহাসের সংগোপন আকান্খা তাঁর প্রতি কর্মে অভিব্যক্তি লাভ করে। এ হচ্চে তাঁর পরিষদের ধারণা। কথাটি তিনিও আপনদল এবং বন্ধুদলের মানুষদের কাছ থেকে এতবেশি শুনেছেন যে নিজেও প্রায় অতিমানব বলে বিশ্বাস করে ফেলেছিলেন। তিনিও মনে করতে আরম্ভ করলেন, যা কিছু হও বলবেন, অমনি হয়ে যাবে। এ যেন শেক্সপীয়রের নাটকের নায়ক জুলিয়াস সিজার। আকাশের জ্যোতিস্কমন্ডল বারেবারে শুভ-সংকেত বয়ে নিয়ে আসে।

শেখ মুজিবুর রহমানের চরিত্রে সীজারের বীরত্ব এবং গুনাগুন বর্তমান ছিল কিনা বিচার করবেন আগামীদিনের এৈতিহাসিক। তবে একথা সত্য যে, পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশ বাংলাদেশে তিনি যা পয়েছেন, যা আদায় করেছেন, অনুরুপ ভাগ্য কোন রোমান সীজারের কোনদিন হয়নি।
সব শক্তিদর্পী মানুষের যেমন হয়ে থাকে তেমনি শেখ মুজিবর রহমানের মনে কিছু নিরীহ বস্তু না পাওয়ার ক্ষোভ বারবার তাঁর অন্তর্লোককে পীড়ন করেছে। শক্তিদর্পী মানুষেরাও চায় মানুষ তাদের ভালাবাসুক বন্ধুর মত, আবার যমের মত ভয় করুক। আকাশের দেবতাকে যে রকম ভীতিমিশ্রিত ভালবাসা দিয়ে বিচার করে, শেখ মুজিবুর রহমানের মনেও অবিকল সে রকম একটি বাসনার উদয় হয়েছিল।
তিনি বিলক্ষন জানতেন, পান্ডিত্যাভিমানী শিক্ষিত সমাজের মানুষ তাঁকে অন্তর থেকে অবজ্গা করেন। এই শ্রেণীটির চরিত্রের খাঁজগুলো সম্বন্ধে পুরোপুরি অবহিত ছিলেন। উনিশ শ’ উনসত্তর সালের পূর্ব পর্যন্ত এই শ্রেনীর লোকেরা তাঁকে বাগাড়ম্বর সর্বস্ব অমার্জিত হামবগ ছাড়া কিছু মনে করতেন না, তা তাঁর অজানা থাকার কথা নয়। বিভিন্ন বিবৃতি, বক্তৃতা, ঘরোয়া বৈঠক এবং আলাপ-আলোচনায় এঁদের প্রতি প্রচ্ছন্ন ঘৃণা এবং বিরক্তি তিনি কুন্ঠাহীনভাবে ব্যক্ত করেছেন। তা সত্তে্ও উচ্চশিক্ষিত আমলা, লেখক-সাহিত্যিক এবং শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যলয়ের শিক্ষক এবং সম্ভ্রন্ত সমাজের একাংশ তাঁকে বংগবন্ধু বলে যে সম্বোধন কেন করতেন শেখ মুজিব তা বুঝতেন এবং তা তাঁর ক্ষমতার স্বাভাবিক প্রাপ্য হিসাবেই গ্রহণ করতেন। তাছাড়া বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবি বলে কথিত শ্রেণীটির হীনমন্যতাবোধ এবং চারিত্রিক দাসত্ব অনেকটা প্রবাদের সামিল। যে-কোন নতুন শাসক এলেই সকলে মিলে তাঁর গুণপনা বাখান করা এখানকার বহুদিনের একটা প্রচলিত প্রথা। কচিত কদাচিত ব্যতিক্রমী কন্ঠ শোনা যায়। এর কারণ নিশ্চয়ই বাংলাদেশের সমাজ শরীরের মধ্যে সংগুপ্ত আছে।

শক্তিদর্পী মানুষেরাও যে শেষ পর্যন্ত একেকটা দিকে কাঙাল থেকে যান শেখ মুজিবের মধ্যেও তার পরিচয় পাওয়া যায়। যে বস্তুটি সহজভাবে পাওয়া যায় না তাকে ভেঙে ফেলার জন্য এঁদের অনেক সময় নিয়মমত খাওয়া-শোয়ার ব্যাঘাত ঘটতে থাকে। তাঁর আসন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমনের ঘটনাটিকেও এ পর্যায়ে ফেলা যায়। যদিও তিনি দেশের একচ্ছত্র অধিপতি তথাপি তাঁর কানের কাছে অনেক উচ্চকন্ঠ চিৎকার করেছে, বাচাল ও অর্বাচীনেরা অনেক বৃথা লিখেছে, কিন্তু পন্ডিতরা বরাবর নিশ্চুপ থেকেছেন। এই অর্থবোধক নিশ্চয়তা তাঁর বুকে শেলের মত বেজেছে। সেজন্যই তাঁর অত ঘটা করে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা। যে লোকেরা সহজভাবে তাঁকে স্বীকার করে নেয়নি, তাঁদেরকে তাঁর মহিমা বুঝিয়ে দেয়ার জন্যই বিশ্ববিদ্যলয়ে আসছেন। নইলে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে শেখ মুজিব সকাল-সন্ধে ভাঙা কাপে চা খেয়েছেন, সেখানে আাসার জন্য সাড়ে সাত লক্ষ টাকা ব্যয় করার কি প্রয়োজন থাকতে পারে? বিশষত বাংলাদেশের মত দেশে যেখানে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠেও এক-তৃতীয়াংশ ছাত্রের পয়সার অভাবে সকাল বেলার টিফিন জোটে না।

তাছাড়া আরেকটি কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা তাঁর জন্য অণিবার্য হয়ে পড়েছিল। যতই তিনি জনগনের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিলেন ততই তাঁর চরিত্রের স্বৈরাচারী লক্ষণসমুহ স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেতে শুরু করেছিল। ক্ষমতার নির্মম একাকীত্ব তাঁকে নিশ্চয়ই বুঝিয়ে দিয়েছিল যে গণতণ্রের ধারাস্রোতে বাহিত হয়ে তিনি এসেছিলেন, তাতে তাঁর পুনরায় অবগাহন করার কোন উপায় নেই। কেননা এই তিন বছরে শরীর অনেক ভারী হয়ে গিয়েছে এবং সাঁতারও প্র‌ায় ভুলে গিয়েছেন। যদি তাঁকে একজন মানুষ হিসেবেই বেঁচে থাকতে হবে – জনতাই তাঁর শাসনের বিষয়বস্তু। তিনি রাজা এঁরা প্রজা। এই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি মনে মনে সাংঘাতিক রকম অধৈর্য হয়ে পড়েছিলেন। সংবিধান, জাতীয় পরিষদ, পরিষদের সদস্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নীতি বলতেন, তিনি জনগনকে ভালবাসেন এটা তাঁর দীর্ঘদিনের অভ্যাস আর জনগন তাঁকে দেখতে ভিড় করতেন, তাঁর বক্তৃতা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, তাঁর কথায় হাত উঠাতেন এটা জনগনের দীর্ঘদিনের অভ্যাস। বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতা শুনে এবং কথায় কথায় হাত উঠিয়ে অভ্যস্ত। আসলে জনগন অনেকদিন থেকেই তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন। কারণ বাংলাদেশের যে দুর্দশা বন্যা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি ধরে নিয়েও বলা যায় তার আশি ভাগই মানুষের সৃষ্টি এবং তাঁর জন্য মুখ্যত দায়ী তাঁর পরিচালিত তৎকালীন সরকার। গ্রামের সরল মানুষকে, অনাহারক্লিষ্টা বিধবাকে আমি নিজের কানে তাদের তাবৎ অভাব অভিযোগের জন্য দায়ী করে অভিস্পাতের বাণী উচ্চারণ করতে শুনেছি। তিনি যে ধীরে ধীরে স্বখাত সলিলে ডুবে যাচ্ছেন খুবই টের পাচ্ছিলেন। জনগনের রুদ্ররোষ কি বস্তু উপলব্ধি করতে সময় লাগেনি। এই জনগনই আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করিয়ে শেখ মুজিবকে আইুয়ব খানের কারাগার থেকে মুক্তমানব হিসেবে প্রসন্ন দিবালোকে বের করে এনেছে। উনিশ শ’ একাত্তর সালের মার্চ মাসের দিনগুলোতে জনগনের সংগবদ্ধ শক্তির গভীরতা, তীব্রতা কতদূর হতে পারে, বাঁধভাঙা বন্যার স্রোতের মত রাস্ট্রীয় এবং সামাজিক জীবনে কি অঘটন ঘটিয়ে তুলতে পারে সে জ্গান তিনি হাতে কলমেই লাভ করেছেন। তাই তিনি ক্রমাগতভাবে জনগনের ক্ষোভ আক্রোশ প্রকাশ করার পন্থা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমুহের মুখে বালির বাঁধ রচনা করে যাচ্ছিলেন। তাই তিনি তিনদল ভেঙে একদল করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী থেকে সরাসরি একনায়ক সেজে বসেছেন।

তিনদিন ভেঙে একদল করার পর তাঁর হাতে প্রভুত ক্ষমতা সন্চিত হয়েছিল বটে, কিন্তু তিনি রাজনৈতিকভাবে সম্পুর্ণ গরঠিকানার মানুষ হয়ে পড়েছিলেন। সম্মিলিতভাবে তিনি তিনদলেরই কর্তা, কিন্তু আসলে কোন দলেরই কেউ নন। এই ঠিকানাহীনতা তাঁকে একনায়কতন্রের দিকে আরো জোরে ঠেলে দিচ্ছিল। জনগন মন অধিনায়ক নেতার পক্ষে একনায়ক পরিচয়ের পথে রাজার পরিচয় আরো প্রীতিপদ এবং সম্মানের। বিশেষত তিনি দেশ এবং বিদেশের সামনে প্রমাণ যখন করতে পেরেছেন, তিনি চাননি তবু জনগন তাঁকে রাজার আসনে বসিয়েছে। এই রাজকীয় পরিচয়টা দেশের মানুষের মনে ভালভাবে দাগ কাটে মত বসিয়ে দেয়ার জন্য তিনি সর্বশক্তি নিয়োগ করে যাচ্ছেন। একদলীয় শাসন কায়েম করেছেন, জাঁকালো রাস্ট্রপতি হয়ে বসেছেন, উপবেশনের সুবিধার জন্য দিনাজপুরের মহারাজার সিংহাসনটা আনিয়ে নিয়েছেন। ব্রিটিশ আমলের ঘূণে ধরা প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু করেছেন। পূর্বের জেলা এবং বিভাগগুলোর সীমানা চিহ্ণ মুছে দিয়ে গোটা দেশেকে একষট্টিটি নতুন প্রশাসনিক এলাকা তথা জেলায় বিভক্ত করে, প্রতি জেলার জন্য একজন করে গভর্ণরও দান মনোনয়ন দান করেছেন। জেলা প্রশাসনের সংগে সরাসরি কেন্দ্রীয় শাসনের সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। গভর্ণররা যাতে সর্বেসর্বা হয়ে বসতে না পারে সেজন্য বৈরী গ্রুপ থেকে একেকজন বাকশাল সাধারন সম্পাদককে মনোনয়ন দান করা হয়েছে। শাসনব্যবসথাকে নতুনভাবে ঢালাই করার নামে আইয়ুবের মত শেখ মুজিবও তাঁর সিংহাসনে থাকার পথটি পাকাপোক্ত করেছেন। আইয়ুবের মৌলিক গণতন্ত্রের মৌলিক বস্তুটির সংগে জনগনের চাক্ষুষ পরিচয় ঘটেছে। মুজিবের মৌলিক বস্তুটিরও প্রয়োজনীয়তা কতদুর ছিল আগামীদিনের প্রশাসনবিদরা বিচার-বিবেচনা করে দেখবেন। আমার বক্তব্য হল, আইয়ুব সরকার এবং মুজিব সরকা নিজেদের ক্ষমতায় অটুট থাকবার জন্য উদ্ভাবিত পথটিকেই শাসনতান্রিক বিপ্লব বলে আখ্যা দিয়েছেন। জেলাসমুহের গভর্নর এবং বাকশালের সাধারন সম্পাদক নিযুক্ত করার ব্যাপারেও শেখ সাহেব রাজকীয় বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। বাংলাদেশের শাসক নেতৃশ্রনীতে যত ধরনের চাপ প্রয়োগক্ষম গ্রুপ রয়েছে, সব গ্রুপ থেকে প্রতিনিধি গ্রহন করেছেন – রাজনৈতিক দল ও ন্যাপ থেকে, আমলাদের থেকে, আইনজীবী শ্রেণী থেকে, সেনাবাহিনী থেকে, আনুপাতিকহারে গভর্নর ও সম্পাদক নিয়েগ করার পেছনরে কারণ ছিল সার্বিকভাবে গোটা শাসক নেতৃশ্রণীটার কাছে তাঁর শাসনটা গ্রহণযোগ্য করে তোলা।

ব্যবহারিক দিক দিয়েও তিনি রাজার মতই আচরন করে যাচ্ছিলেন। তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দের কেউ তাঁর সামনে টু-শব্দটি উচ্চারণ করতে সাহস পেতেন না। তাঁকে বুদ্ধি পরামর্শ দিতে পারে মত কেউ ছিলেন না। তিনি যদি কখনো মন্ত্রিসভার সদস্যদের ডাকার প্রয়োজন মনে করতেন, ডাকতেন। এ কারণে যে তাঁর নিজস্ব পরিবারটিকে কেন্দ্র করে একটি রাজপরিবারের ছবি ক্রমশ লক্ষ্যগোচর হয়ে উঠেছিল। তাঁর ছেলে, তাঁর ভাগ্নে, ভগ্নিপতি, ভাই সকলে সত্যি সত্যি দুধের সরের মত বাংলাদেশের শাসকশ্রণীর পুরোভাগে ভেসে উঠেছিলেন। বাকি ছিল রাজমুকুটটা মস্তকে ধারণ করা এবং রাজউত্তরীয়খানি অঙে চড়িয়ে দেয়া। এই জন্যই তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। নেপোলিয়নের মত বিশ্ববিখ্যাত বীরযোদ্ধাও হাতে প্রভুত ক্ষমতা থাকা স্বত্তেও রাজমুকুটটি নিজে নিজে পরে বসেননি। রোম থেকে পোপকে আসতে হয়েছিল। এই সমস্ত শক্তিধর মানুষেরা শক্তি দিয়ে সব কাজ করো আনলেও শেষের কাজটি করাবার জন্য এমন কাউকে খোঁজ করে আনেন, যাঁর প্রতি মানবসাধারণের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা রয়েছে এবং যা এৈতিহ্যসম্মত।

নেপোলিয়নের যুগ গেছে, পোপের যুগ গেছে। কিন্তু মানুষের অন্তরের আগুন সে রকম আছে। উচ্চাকাঙ্খা উদ্ধত হয়ে এখনো আকাশ ফুঁড়ে ফেলতে চায়। তাই শেখ মুজিবুর রহমান আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আসছেন। একক হাতে বেবাক ক্ষমতা তুলে নেয়ার স্বপক্ষে সাসস্বত সমাজের রায় গ্রহণ করবেন। তাছাড়া আরেকটি গোপন অভিলাষ তাঁর মনের কোনে থাকাও বিচিত্র কি। উচ্চশক্ষাভিমানী পন্ডিতম্মন্য লোকেরা যাঁদের তিনি মনে মনে অপরিসীম তাচ্ছিল্য করেন, তাঁরা সকলে একযোগে এসে তাঁর বিরাটত্ব ও মহত্তের সামনে দন্ডবত হবেন। একজন শিক্ষকও যাতে অনুপস্থিত না-থাকতে পারেন এবং একজনও যাতে অর্থহীন নীরিহ একগুঁয়েমীকে আশ্রয় করে কাগুজে বীর হিসেবে পরিচিত না-হতে পারেন আগেভাগে সে ব্যবস্থা করা হয়েছে।

স্বাধীনতার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ সরকারসমর্থক ছাত্রদের যাবতীয় দুর্নীতির আখড়াতে পরিনত হয়েছিল। পাকিস্তানি শাসনামলে সামরিক সরকারের আরোপিত হাজারো বাধা-বিঘ্ন অগ্রাহ্য করে বাঙালি মনীষা পাথরের ভেতর দিয়ে পথ কেটে একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের পানে অগ্রসর হচ্ছিল। কি সংস্কৃতি চর্চায়, কি রাজনৈতিক চেতনার বিকাশে, কি মননশীলতার লাবণ্য সন্চারে পাকিস্তান আমলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে ভুমিকা পালন করেছে তা বাঙালির জাতীয় ইতিহাসে চিরস্মরনীয় হয়ে থাকবে। বাংলাভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ, বাংলার জাতীয় জাগরনের প্রথম আন্দোলন, উনিশ শ’ উনসত্তরের আইয়ুব বিরোধী বিক্ষোভ, একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধ এ সকল জাতীয় জীবনে অপরিসীম প্রভাববিস্তারী ঘটনাগুলো ঘটিয়ে তোলার উদ্যোগপর্বে নেতৃত্বদান করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। উন্নয়নশীল দেশসমুহের রাজনীতিতে ছাত্ররা অনিবার্যভাবে কোন্‌ ভুমিকা পালন করে থাকেন শেখ মুজিব তা জানতেন। তিনি নিজেও এরকম ছাত্র আন্দোলনের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছেন। তাই তাঁকে শুরু থেকেই ছাত্রদের কঠোর নিয়ন্ত্রনে রাখার বিষয়টি অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে ভাবতে হয়েছে।
তিনি বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করার কিছুদিন পরই দেখেছেন যে, যে ছা্ত্রপ্রতিষ্ঠানটির পেশল সমর্থন তাঁর একমাত্র রাজনৈতিক মুলধন ছিল সেই ছাত্রলীগকে চোখের সামনে দু’টুকরো হয়ে যেতে, তাঁর ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়া, ছাত্রলীগের অপরাংশের সক্রিয় সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে অপর একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলকে মাথা তুলে দাঁড়াতে দেখে তাঁকে নিশ্চয়ই হতবাক করে থাকবে। উনিশ শ’ তিয়াত্তর সালের পয়লা জানুয়ারির ঘটনা। ভিয়েতনামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিবাদ করে বাংলাদেশের ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যকেন্দ্রের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করলে পুলিশ বিক্ষোভকারী ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষন করে। ফলে একজন ছাত্র ঘটনাস্থলে নিহত হয়, কয়েকজন মারাত্বকভাবে আহত হয়। তার প্রতিবাদে ছাত্র ইউনিয়ন সমস্ত ঢাকা শহরে প্রতিবাদ সভা এবং মিছিলের আয়োজন করে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যাকারী আখ্যায় ভুষিত করে। সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চালিত ‘ন্যাপ’ এবং ‘বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টি’র সমর্থক ইউনিয়নের দখলে ছিল। তাঁর এই গুলিবর্ষনের প্রতিবাদস্বরুপ বিক্ষুদ্ধ ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা ছাত্রসংসদের খাতায় যে পৃষ্ঠাটিতে শেখ মুজিবুর রহমান কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের আজীবন সদস্য হিসেবে সাক্ষর করেছিলেন সেই পৃষ্ঠাটিকে ছিড়েঁ ফেলে। অথচ এই ছাত্র ইউনিয়নই পদে পদে শেখ মুজিবুর রহমানকে তাদের মূল রাজনৈতিক দলদু’টোর মত অন্ধভাবে সমর্থনদান করে যাচ্ছিল। নিজের সমর্থক ছাত্ররা যখন এ অভাবনীয় কান্ড ঘটিয়ে তুলতে পারে, বিরোধীদলীয় ছাত্ররা যে প্রতিবাদে কতদূর মারমুখী হতে পারে, একটি সম্যক ধারণা তাঁর হয়েছিল। তাঈ শক্তহাতে বিশ্ববিদ্যালয়সমুহ বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয় এবং ছাত্রসমাজকে নিয়ন্ত্রনে রাখার সিদ্ধান্ত্ব তিনি গ্রহণ করেছিলেন।

উনিশ শ’ বাহাত্তর সালের পর থেকে প্রকৃত প্রস্তাবে চার পাঁচজন ছা্ত্রই স্টেনগান হাতে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ চালাত। উপাচার্যবৃন্দ এই অস্ত্রধারী ছা্ত্রদের কথাতে উঠতেন, বসতেন। স্বাধীনতার পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মুক্তির দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল, কিন্তু স্বাধীনতার পর বিশ্ববিদ্যলয়ের বেবাক পরিবেশটাকেই কলুষিত করে তোলা হল। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন চিন্তা, কল্পনা, নিরপেক্ষ গবেষনার পথ একেবারে বন্ধ হয়ে গেল। সরকার সমর্থক ছা্ত্ররা প্রকাশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করত। দরকারবোধে তারা এগুলো ব্যবহার করতে কোন রকম কুন্ঠা বা সংকোচবোধ করত না। বর্তমানে ঢাকা জেলার জেলা জজের কোর্টে একটি লোমহর্ষক হত্যামামলার বিচার চলছে। সরকার সমর্থক দু’দল ছা্ত্রের মধ্যে মতামতের গরমিল হওয়ায় অবাধে রাতের বেলা অগ্নেয়াস্ত্র ব্যাবহার করে সাতজন সতীর্থকে হত্যা করেছে। আজ থেকে প্রায় একবছর পূর্বে হাজী মুহম্মদ মহসীন ছাত্রাবাসের টিভি কক্ষের সামনেই এই শোকাবহ ঘটনা অনুষ্ঠিত হয়। সরকারসমর্থক ছাত্ররাই যখন মতামতের গড়মিলের জন্য স্বদলীয় ছাত্রের হাতে এভাবে বেঘোরে প্রাণ হারাতে পারে, সাধারণ ছাত্র এবং শিক্ষকদের অবস্থা কি হতে পারে সহজেই অনুমান করা যায়। সরকারসমর্থক ছাত্রের মত শিক্ষকদেরও একটি বিশেষ অসুবিধা হবার কথা নয়। এঁদের অনেকে পুর্ব

মুজিবের শাসন: একজন লেখকের অনুভব – আহমদ ছফা – ১

মুজিবের শাসন: একজন লেখকের অনুভব – আহমদ ছফা – ৩

উৎস: সহায়ক এক