4e1ef8d9a63adcea4e6e0eaf962b6c78_xlarge

আহমদ ছফা (জুন ৩০, ১৯৪৩ – জুলাই ২৮, ২০০১)

একজন বাংলাদেশী লেখক, কবি ও সমাজবিজ্ঞানী। তাঁর লেখায় বাংলাদেশী জাতিসত্তার পরিচয় নির্ধারণ প্রাধান্য পেয়েছে। তিনি ২০০২ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্যে মরণোত্তর একুশে পদক লাভ করেন।[১] জীবদ্দশায় আহমদ ছফা তাঁর প্রথাবিরোধী, নিমোর্হ, অকপট দৃষ্টিভঙ্গীর জন্য বুদ্ধিজীবি মহলে বিশেষ আলোচিত ছিলেন।

তাঁর জন্ম ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের ৩০শে জুন চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার হাশিমপুর ইউনিয়নের গাছবাড়িয়া গ্রামে। তাঁর পিতা মরহুম হেদায়েত আলী ওরফে ধন মিয়া। মা মরহুমা আসিয়া খাতুন। দুই ভাই চার বোনের মধ্যে আহমদ ছফা ছিলেন বাবা-মার দ্বিতীয় সন্তান।জন্ম

শিক্ষা

প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাকের সংগে আহমদ ছফা, ১৯৯৫

আহমদ ছফার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় তাঁর পিতার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ গাছবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে নিজের গ্রামের নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। ছাত্রাবস্থায় সুধাংশু বিমল দত্তের মাধ্যমে কৃষক সমিতি-ন্যাপ বা তৎকালীন গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত হন। মাস্টারদা সূর্যসেনের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁরা কয়েকজন বন্ধু মিলে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেললাইন উপড়ে ফেলেন। পরে গ্রেপ্তার এড়াতে কিছুকাল পার্বত্য চট্টগ্রামে আত্মগোপন করেন।[২] ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম নাজিরহাট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন ; একই বৎসরে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে।[৩] পরে বাংলা বিভাগে ক্লাশ করা অব্যাহত রাখেননি। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ থেকে প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।[৩] ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে এমএ পরীক্ষা দেয়ার আগেই বাংলা একাডেমীর পিএইচডি গবেষণা বৃত্তির জন্য আবেদন করেন এবং তিন বছরের ফেলোশিপ প্রোগ্রামের জন্য মনোনীত হন। গবেষণার বিষয় ছিল ‘১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার মধ্যবিত্তশ্রেণীর উদ্ভব, বিকাশ, এবং বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে তার প্রভাব’।[৪] ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে প্রাইভেটে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ পরীক্ষা দেন।[৫] মৌখিক পরীক্ষা হয় একুশে মার্চ। [৩] পিএইচডি সম্পন্ন করা পরে আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি।[৬]

পরে ১৯৮৬-তে জার্মান ভাষার ওপর গ্যোটে ইনস্টিটিউটের ডিপ্লোমা ডিগ্রিও লাভ করেন তিনি, যে জ্ঞান তাঁকে পরবর্তী সময়ে গ্যাটের অমর সাহিত্যকর্ম ফাউস্টঅনুবাদে সাহস জুগিয়েছিল।

সাহিত্য

sofa-nasir11

তিনি সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। গল্প, গান, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ, ইতিহাস, ভ্রমণকাহিনী মিলিয়ে তিরিশটির অধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন।

আহমদ ছফার প্রথম গ্রন্থ একটি উপন্যাস- সূর্য তুমি সাথী। প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে।[৮] স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম গ্রন্থ হিসেবে মুক্তধারা থেকে প্রকাশ পায় তাঁর প্রবন্ধ গ্রন্থ জাগ্রত বাংলাদেশ। প্রকাশকাল শ্রাবণ ১৩৭৮ বা জুলাই ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ।[৯] ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে পিএইচডি অভিসন্দর্ভের জন্য জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের সান্নিধ্যে আসেন। দীর্ঘকাল তাঁদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় থাকে। ১৯৭১ সালে ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’ গঠন ও এর বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয় অংশ নেন। সাতই মার্চ ‘স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পত্রিকা’ হিসেবে প্রতিরোধ প্রকাশ করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এপ্রিল মাসে কলকাতা চলে যান। মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে সেখান থেকে দাবানল নামের পত্রিকা সম্পাদনা করেন।[৩] দেশ স্বাধীন হবার পর বাংলাদেশে ফিরে লেখালেখি করতে থাকেন। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে দৈনিক গণকণ্ঠ ধারাবাহিকভাবে ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ রচনা প্রকাশ করেন। এর কারণে তৎকালীন সরকারের রোষে পড়তে হয় তাঁকে।[১০] ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে সিপাহী বিদ্রোহের ইতিহাস গ্রন্থ প্রকাশ পায়। ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক নাজিমুদ্দিন মোস্তানের সহায়তায় কাঁটাবন বস্তিতে ‘শিল্পী সুলতান কর্ম ও শিক্ষাকেন্দ্র’ চালু করেন। বাংলা একাডেমী থেকে বাঙালি মুসলমানের মন প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশ পায় ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে ।

6a0120a8971a64970b017616b92e9d970c-800wi

ছফা মহাকবি গ্যোতের ফাউস্ট অনুবাদ শুরু করেন ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে । মুক্তধারা থেকে ফাউস্টের অনুবাদ বের হয় ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে । ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস অলাতচক্র। স্বাধীন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতির গোপন-রহস্য, শৌর্য মৃত্যু ও কপটতার গীতিকা এই উপন্যাস।[১২] ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গপুরাণ এবং অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী প্রকাশিত হয়। ‘অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী’ পূর্বে একটা সাপ্তাহিক পত্রিকায় প্রাণপূর্ণিমার চান নামে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল। জাপানী ভাষায় পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গপুরাণ উপন্যাসের অনুবাদ প্রকাশ পায় ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে ।[১৩] পুষ্প, বৃক্ষ, বিহঙ্গ ঘুরে সুশীল সমাজের ব্যবচ্ছেদ হয়েছে তাঁর এই উপন্যাসে। বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক ও সমসাময়িক কালের বিশিষ্ট পণ্ডিত অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের প্রসঙ্গে রচিত যদ্যপি আমার গুরু প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে ।

6a0120a8971a64970b017616b93082970c-800wi

তাঁর জীবদ্দশায় আহমদ ছফা রচনাবলি প্রকাশ শুরু হয়। ২০০১ খ্রিস্টাব্দে আহমদ ছফা রচনাবলি দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশ পায়। [১৪] জীবিত থাকাকালীন আহমদ ছফা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কলাম লেখা অব্যাহত রেখেছেন।

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ

যদ্যপি আমার গুরু গ্রন্থের কাইয়ুম চৌধুরীকৃত প্রচ্ছদ

প্রবন্ধ

  • জাগ্রত বাংলাদেশ, ১৯৭১
  • বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস, ১৯৭২
  • বাংলা ভাষা: রাজনীতির আলোকে, ১৯৭৫
  • বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা, ১৯৭৭
  • বাঙালি মুসলমানের মন, ১৯৮১
  • শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য প্রবন্ধ, ১৯৮৯
  • Aspect of Social Harmony in Bangla Culture and Peace Song, ১৯৯১
  • রাজনীতির লেখা, ১৯৯৩
  • আনুপূর্বিক তসলিমা ও অন্যান্য স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ, ১৯৯৪
  • নিকট ও দূরের প্রসঙ্গ, ১৯৯৫
  • সঙ্কটের নানা চেহারা, ১৯৯৬
  • সাম্প্রতিক বিবেচনা: বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস, ১৯৯৭
  • শরবর্ষের ফেরারী: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ১৯৯৭
  • শান্তিচুক্তি ও নির্বাচিত প্রবন্ধ, ১৯৯৮
  • বাঙালি জাতি এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র, ২০০১
  • উপলক্ষের লেখা, ২০০১
  • আমার কথা ও অন্যান্য প্রবন্ধ, ২০০২
  • সেইসব লেখা, ২০০৮

অনুবাদ

  • তানিয়া (মূল: পি. লিডভ), ১৯৬৭
  • সংশয়ী রচনা: বার্টাণ্ড রাসেল, ১৯৮২
  • ফাউস্ট (মূল: ইয়োহান ভোলফ্‌ গাঙ ফন গ্যোতে), ১৯৮৬

কবিতা

  • জল্লাদ সময়, ১৯৭৫
  • দুঃখের দিনের দোহা,১৯৭৫
  • একটি প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা, ১৯৭৭
  • লেনিন ঘুমোবে এবার, ১৯৯৯

উপন্যাস

  • সূর্য তুমি সাথী, ১৯৬৭
  • ওংকার, ১৯৭৫
  • একজন আলী কেনানের উত্থান-পতন, ১৯৮৮
  • মরণবিলাস, ১৯৮৯
  • অলাতচক্র, ১৯৯৩
  • গাভী বিত্তান্ত, ১৯৯৫
  • অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী, ১৯৯৬
  • পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ, ১৯৯৬

গল্পসংগ্রহ

  • নিহত নক্ষত্র,১৯৬৯

ইতিহাসগ্রন্থ

  • সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস, ১৯৭৯

সৃজনশীল জীবনী

  • যদ্যপি আমার গুরু, ১৯৮৮

কিশোর গল্প

  • দোলো আমার কনকচাঁপা, ১৯৬৮

শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ

  • গো-হাকিম, ১৯৭৭

পুরস্কার

তিনি লেখক শিবির পুরস্কার ও বাংলা একাডেমী কর্তৃক সাদত আলী আখন্দ পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন।  ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে ইতিহাস পরিষদ পুরস্কার গ্রহণ করেছেন বলে জানা যায়। তাঁকে ২০০২ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্যে (মরণোত্তর) একুশে পদক প্রদান করা হয় ।

মৃত্যু

২০০১ খ্রিস্টাব্দের আটাশে জুলাই অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে নেয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে জানাজা শেষে মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবি গোরস্থানে তাঁর দাফন হয়।

উৎস:সহায়ক এক,সহয়াক দুই